চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে বাবা রূপলাল রবিদাসকে হারানোর পর তার ১৪ বছরের ছেলে জয় রবিদাস স্কুল ছেড়ে পৈতৃক পেশা জুতা সেলাইয়ের কাজ শুরু করেছে। বাবা রূপলাল রবিদাস ও তার ভাগ্নিজামাই প্রদীপ লাল রবিদাসকে গত ৯ আগস্ট রাতে তারাগঞ্জ উপজেলায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে জয়কেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে।
নবম শ্রেণির ছাত্র জয়ের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কিন্তু এখন তার বাবার ফেলে যাওয়া ফুটপাতের কাঠের চৌকিতে বসে সে জুতা সেলাই ও পালিশ করছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই কাজ করে সে। জয় জানায়, তার দাদি, মা এবং দুই বোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। সে বলে, “বাবা বেঁচে থাকলে আমাকে হয়তো এত তাড়াতাড়ি এই কাজে আসতে হতো না।” জয়ের একমাত্র আশা, সে তার দুই বোনকে পড়াশোনা করাতে পারবে।
স্থানীয় দোকানদার সেতু মিয়া জানান, রূপলাল একজন নিরীহ মানুষ ছিলেন এবং তিনি কখনো কোনো ঝগড়ায় জড়াতেন না। তাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তার পরিবার পথে বসেছে। জয়ের জুতা সেলাই করতে দেখে তার মন খারাপ হয়।
রূপলালের বড় মেয়ে নুপুর রবিদাস জানান, তাদের বাড়িতে আসার পথে চোর সন্দেহে তার বাবা ও প্রদীপ লালকে আটক করে মারধর করা হয়। খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের রক্তাক্ত দেহ শনাক্ত করেন। নুপুর বলেন, “বাবাই ছিলেন আমাদের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাকে হারিয়ে আমাদের পুরো পরিবার দিশেহারা।” তিনি আরও বলেন, জয়ের রোজগারে সংসার চলছে, এটাই তাদের সবচেয়ে বড় দুঃখ।
রূপলালের স্ত্রী ভারতী রানী রবিদাস বলেন, “সংসারে আর কোনো পুরুষ নেই, জয়ই এখন একমাত্র ভরসা।” তিনি জানান, ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে না পেরে তার বুক ফেটে যাচ্ছে।
মামলা নিয়ে বিতর্ক
গণপিটুনির ঘটনার পরদিন ১০ আগস্ট রূপলালের স্ত্রী ভারতী রানী বাদী হয়ে ৫০০-৭০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে এই মামলার এজাহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জয়ের অভিযোগ, তার বাবাকে যখন মারা হচ্ছিল তখন পুলিশ ঘটনাস্থলে ছিল, কিন্তু মামলার নথিতে তা উল্লেখ করা হয়নি। জয় বলে, “পুলিশ লিখছে, পুলিশ নাকি হাসপাতালে দেখছে।” সে আরও দাবি করে, পুলিশ নিজ থেকে মনগড়া তথ্য দিয়ে মামলা সাজিয়েছে এবং তার মায়ের কাছ থেকে কেবল সই নিয়েছে। ভারতী রানী নিজেও জানান, তিনি মামলার বিষয়ে কিছু জানেন না এবং কাগজে কী লেখা আছে, তা-ও জানেন না।
খবরওয়ালা/টিএসএন



