নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ একই পরিবারের চারজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার দুই দিন পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌ-পুলিশের তল্লাশিতে সজীব, সামিয়া আক্তার ও ছোট শিশু সামিনের মরদেহ পাওয়া যায়। তবে তাঁদের বাবা হেলাল উদ্দিন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।
শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজার এলাকার আল মোস্তফা ফ্যাক্টরির সামনে মেঘনা নদী থেকে একে একে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারীদের কাছ থেকে খবর পাওয়ার পর স্বজনেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন। পরে সামিয়াসহ উদ্ধার হওয়া তিনজনের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়।
উদ্ধার হওয়া তিনজন হলেন হেলাল উদ্দিনের ছেলে সজীব, মেয়ে সামিয়া আক্তার এবং ছোট ছেলে সামিন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সামিয়ার বয়স ১৭ বছর, সজীবের ২৪ বছর এবং সামিনের পাঁচ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। অন্যদিকে পরিবারের প্রধান হেলাল উদ্দিনের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় উৎকণ্ঠা এখনো কাটেনি।
বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনা
গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রাম থেকে আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজারের উদ্দেশে ট্রলারে রওনা হয় পরিবারটি। তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন স্বজন ছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে ট্রলারটিতে ১৩ থেকে ১৪ জন যাত্রী থাকার কথা জানা গেছে। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল গরু, খাসি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও।
ট্রলারটি সোনারগাঁয়ের সোনাময়ী এলাকার কাছাকাছি মেঘনা নদীতে পৌঁছালে হঠাৎ ঝোড়ো বাতাস শুরু হয়। নদীতে ঢেউ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত প্রতিকূল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ট্রলারে পানি উঠতে শুরু করলে সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে ডুবে যায়।
দুর্ঘটনার পর আশপাশে থাকা লোকজন ও একটি ট্রলারের যাত্রীরা উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। কয়েকজন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন। তবে কয়েকজন নদীর পানিতে তলিয়ে যান এবং তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন নিখোঁজ হন।
প্রথম দিনেই উদ্ধার হয় এক নারীর মরদেহ
ট্রলারডুবির পরপরই স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। দুর্ঘটনার পর একজন নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর নাম রায়েসা বেগম অথবা রাশিদা বেগম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাঁর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
এরপরও মেঘনা নদীতে নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালানো হয়। নদীতে স্রোত ও পানির গভীরতার কারণে ডুবুরি দলের জন্য কাজটি সহজ ছিল না। সম্ভাব্য বিভিন্ন এলাকায় নৌযান নিয়ে খোঁজ চালানোর পাশাপাশি পানির নিচেও তল্লাশি করা হয়।
দুই দিনের অপেক্ষার পর মিলল তিন মরদেহ
দুই দিন ধরে চলা উদ্ধার অভিযানের মধ্যে শনিবার সকালে প্রথমে সামিয়ার মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে জানানো হয়, ভোরের দিকে তাঁর মরদেহ নদীতে ভেসে ওঠে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌ-পুলিশ সজীব ও সামিনের মরদেহও উদ্ধার করে।
উদ্ধার করা মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর তাঁদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একই পরিবারের তিন ভাই-বোনের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে ভারী শোক।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন জানিয়েছেন, নিখোঁজ চারজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হেলাল উদ্দিন। তাঁর সন্ধানে মেঘনা নদীতে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো।
হেলাল উদ্দিনের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত পরিবারের স্বজনদের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। দুর্ঘটনার পর দুই দিন পেরিয়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার হলেও নদীতে নিখোঁজ থাকা আরেক স্বজনের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই অনিশ্চয়তাই এখন পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।


