কবীর ও ফকির লালন শাহের আধ্যাত্মিক সংগীত সময়, সমাজ ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে মানুষের মধ্যে মানবতা, প্রেম, আত্মঅন্বেষণ এবং বিভাজনমুক্ত সমাজের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। দুই সাধকের দর্শন ও ভাবসংগীতের পারস্পরিক মিল নতুন প্রজন্মের সামনে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে গবেষণা, আলোচনা ও সংগীতচর্চা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রংপুরে আয়োজিত কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসবের বক্তারা।
রোববার রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসবের ষষ্ঠ আয়োজন। লালন বিশ্বসংঘের উদ্যোগে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উৎসবে আলোচনা ও সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে কবীর ও লালনের ভাবদর্শন তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী। তিনি বলেন, কবীর ও লালনের সংগীত কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁদের ভাবধারা মানুষের আত্মিক জিজ্ঞাসা, মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সম্প্রীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তা সময়ের সীমা পেরিয়ে সর্বজনীন আবেদন তৈরি করেছে।
উপাচার্য আরও বলেন, লালনের গানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে কবীরের দর্শন ও সংগীতকে নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সামনে কবীর ও লালনকে পাশাপাশি উপস্থাপন করা হলে তাঁদের চিন্তাভাবনার মধ্যে থাকা সম্পর্ক, সাদৃশ্য ও স্বাতন্ত্র্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, কবীর ও লালনের জীবন, দর্শন এবং আধ্যাত্মিক চর্চার প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহকে কেন্দ্র করে তাঁদের ভাবধারা নিয়ে আরও গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তুলনামূলক গবেষণার মাধ্যমে দুই সাধকের দর্শনের মিল ও বৈশিষ্ট্য আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. মাহবুবুর রশীদ। কবীর ও লালনের দর্শন নিয়ে বক্তব্য দেন মাওলানা আবদুল জলিল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লালন বিশ্বসংঘের প্রধান নির্বাহী ও কবীর-লালন গবেষক আবদেল মান্নান।
উৎসবের দ্বিতীয় অধিবেশনে ছিল সংগীত পরিবেশনা। ‘কবীর থেকে লালন: চিরন্তন প্রেমের অবিনশ্বর সেতু’ শিরোনামের এই পর্বে কবীর ও লালনের ২০টি কালাম পরিবেশন করেন কবীর-লালন মিউজিক্যাল মিশনের শিল্পীরা। এর আগে উৎসবের বিভিন্ন বিভাগীয় আয়োজনেও এই ধারার সংগীত পরিবেশিত হয়েছে।
কবীর ও লালনের ভাবসংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের ভেতরের আত্মসন্ধান এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নতুন উপলব্ধি। তাঁদের গানে প্রেম, মানবতা, আত্মজিজ্ঞাসা ও সামাজিক বিভাজন অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ফলে তাঁদের সংগীত কেবল আধ্যাত্মিক অনুভূতির প্রকাশ নয়, একই সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধেরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
এই ভাবধারাকে সামনে রেখেই এবারের উৎসবে আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনার পাশাপাশি সরাসরি সংগীত পরিবেশনের আয়োজন করা হয়। এতে দর্শক-শ্রোতারা একদিকে যেমন দুই সাধকের দর্শন সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, অন্যদিকে তাঁদের সংগীতের মধ্য দিয়ে সেই দর্শনের আবহও অনুভব করার সুযোগ পেয়েছেন।
দেশের আটটি বিভাগে আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে এই উৎসবের যাত্রা শুরু হয় ঢাকায় গত ১১ সেপ্টেম্বর। ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন বিভাগে আলোচনা, গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনা এবং ভাবসংগীতের আয়োজন করা হচ্ছে। আয়োজকদের লক্ষ্য, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে কবীর ও লালনের আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী চিন্তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সহজভাবে তুলে ধরা।
রংপুরে ষষ্ঠ আয়োজনের পর উৎসবের পরবর্তী কর্মসূচি হওয়ার কথা রয়েছে চট্টগ্রামে। আগামী ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সপ্তম আয়োজন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এরপর সিলেট বিভাগের প্রতিনিধিত্বকারী সমাপনী আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে শ্রীমঙ্গলে। আগামী ৩০ অক্টোবর জেলা পরিষদ বহুমুখী মিলনায়তনে উৎসবের শেষ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশজুড়ে ধারাবাহিক এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে কবীর ও লালনের সংগীত, দর্শন এবং মানবতাবাদী চিন্তার সম্পর্ককে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরা হচ্ছে। রংপুরের আয়োজনেও আলোচনা ও সংগীত পরিবেশনার সমন্বয়ে সেই প্রচেষ্টারই প্রতিফলন ঘটেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে দুই সাধকের দর্শন ও সংগীতকে পৌঁছে দিতে এমন আয়োজন ভবিষ্যতে গবেষণা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।



