রাজধানীর প্রবেশমুখে যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইয়ের আতঙ্ক

রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনে এই এলাকা দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেন। সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড, দোলাইরপাড় ও যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা ঘিরে মানুষের চলাচল সব সময়ই বেশি। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেই ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় যাত্রী ও স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা।

সাম্প্রতিক সময়ে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও দোলাইরপাড় এলাকার বাসিন্দা, যাত্রী এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোর, সন্ধ্যা ও রাতের দিকে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। ব্যস্ত সড়ক, যানজট, গণপরিবহনের চাপ এবং দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ অপরাধীদের জন্য সুবিধা তৈরি করে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি এমনই এক ঘটনার শিকার হন চিকিৎসক শামসুন্নাহার হেনা। রাঙামাটি থেকে ঢাকায় এসে যাত্রাবাড়ীতে নামার পর তিনি রিকশায় সদরঘাটের দিকে যাচ্ছিলেন। যাত্রাবাড়ী মোড়ের কাছে তিন ব্যক্তি রিকশাটির গতিরোধ করে তাঁকে ও চালককে অস্ত্রের ভয় দেখায়। পরে তাঁর মুঠোফোন ও লাগেজ নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। পরদিন তিনি থানায় মামলা করেন।

যানজটে আটকে থাকা গাড়িও নিরাপদ নয়

শুধু পথচারী বা রিকশার যাত্রী নয়, যানজটে আটকে থাকা ব্যক্তিগত গাড়ির যাত্রীরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন। গত ১২ আগস্ট মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়কে যানজটে আটকে থাকা একটি গাড়ির সামনে আরেকটি গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ার চেষ্টা করার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন রাজু শেখ। গাড়ির যাত্রীরা ওই ব্যক্তিকে ধরে মারধর করলেও পরে সে তাঁদের গাড়ির পিছু নেয়। ঘটনার একটি অংশের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ যানজটের সময় গাড়ির গতি কমে গেলে বা যানবাহন দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকলে যাত্রীদের ব্যক্তিগত সামগ্রী নিয়ে পালানোর সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে জানালার পাশে থাকা মুঠোফোন, গয়না বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মামলার পাশাপাশি রয়েছে প্রাণহানির ঘটনাও

যাত্রাবাড়ী থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ছিনতাই ও ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় ১১৯টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ছিনতাই, ছিনতাইচেষ্টা ও ডাকাতিচেষ্টার অভিযোগে ১ হাজার ১৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে পুলিশের নথিতে থাকা মামলার সংখ্যা দিয়ে যাত্রাবাড়ীর ছিনতাই পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ অনেক ভুক্তভোগী হয়রানি, সময়ের অভাব, উদ্ধার নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা অন্য কারণে থানায় অভিযোগ করেন না। ফলে বাস্তবে সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা নথিভুক্ত মামলার তুলনায় বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

এই সময়ের মধ্যে ছিনতাইকারীদের হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার তথ্যও রয়েছে। নিহতদের মধ্যে কাওসার হাওলাদার, অটোরিকশাচালক মো. ইউসুফ এবং কাপড় ব্যবসায়ী আশীষ জোয়ারদারের নাম রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের কয়েকজনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছিল।

কোন এলাকাগুলোতে ঝুঁকি বেশি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের করা ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, কাজলারপাড়, চট্টগ্রাম মহাসড়কের কিছু অংশ, দোলাইরপাড় এবং সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডকে তুলনামূলক বেশি অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব স্থানে মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় অপরাধীরা ভিড়ের মধ্যে সহজে মিশে যেতে পারে। পাশাপাশি সড়ক ও সংযোগপথের সংখ্যা বেশি থাকায় ছিনতাইয়ের পর দ্রুত স্থান পরিবর্তনের সুযোগও থাকে। ভোর ও সন্ধ্যার সময়কে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সায়েদাবাদ থেকে দূরপাল্লার বাসে যাতায়াতকারী যাত্রীদেরও প্রায়ই সতর্ক করা হয়। বাসের জানালা দিয়ে মুঠোফোন, গয়না বা অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় পরিবহনকর্মীরা অনেক সময় জানালা বন্ধ রাখতে বলেন।

এক যাত্রীর ভাষ্য, যাত্রাবাড়ী এলাকায় তাঁদের বাসের জানালা বাইরে থেকে কয়েকবার খোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে সামনের একটি বাসের জানালা দিয়ে এক ব্যক্তির মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে পালাতে দেখা যায় একজনকে।

পুলিশ বলছে, অভিযান চলছে

যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাজু জানিয়েছেন, ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তাঁর দাবি, আগের তুলনায় এলাকায় অপরাধের মাত্রা কমেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ভাসমান অপরাধীদের একটি অংশ এসব ঘটনায় জড়িত।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে শুধু অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি করা কঠিন।

যাত্রাবাড়ীর নিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ

যাত্রাবাড়ী শুধু রাজধানীর একটি ব্যস্ত এলাকা নয়; এটি দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথ। সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানীতে আসা-যাওয়া করেন। ফলে এই এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে ঢাকায় প্রবেশকারী বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন চলাচল সরাসরি জড়িত।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি, যানজটপ্রবণ অংশে নজরদারি এবং অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও ভোর, সন্ধ্যা ও রাতে চলাচলের সময় মূল্যবান সামগ্রী প্রকাশ্যে ব্যবহার না করা এবং অপরিচিত ব্যক্তির গতিবিধি সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ব্যস্ত প্রবেশমুখ হিসেবে যাত্রাবাড়ীতে মানুষের চাপ প্রতিদিনই থাকবে। সেই বাস্তবতায় অপরাধ দমনে সাময়িক অভিযান নয়, বরং নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Tags :

ratul Khaborwala

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।