আমন ধানের ভরা মৌসুমে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা। ডিলারের দোকানে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য সার পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও করছেন কৃষকেরা।
রোববার সকালে পবা উপজেলার দারুসা বাজারে সার কিনতে যান কৃষক সাজ্জাদ। তাঁর প্রয়োজন ছিল ২০ কেজি সার। প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র পাঁচ কেজি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, সার সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, ফলে কৃষিকাজেও সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তার ওপর প্রয়োজনের মাত্র এক-চতুর্থাংশ সার পাওয়ায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
দারুসা বাজারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের সার ডিলার জীবন কুমারের দোকানের সামনে এদিন শতাধিক কৃষককে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কৃষকদের অভিযোগ, ডিএপি ও টিএসপি সার সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনতে গেলে নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে।
কৃষক হজরত আলী বলেন, ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। অন্যদিকে খুচরা বাজারে বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। আরেক কৃষক শামসুর রহমানের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের কারণে সারের সংকট তৈরি হয়েছে এবং এর চাপ পড়ছে কৃষকদের ওপর।
নির্ধারিত দামের তুলনায় বেশি
রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারের বাজারে দামের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
ইউরিয়া সারের ৫০ কেজির বস্তার সরকারি মূল্য এক হাজার ৩৫০ টাকা। কৃষকদের অভিযোগ, খুচরা বাজারে একই বস্তা কিনতে প্রায় দুই হাজার ৬০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এক হাজার টাকা দামের এমওপি সারের জন্য নেওয়া হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকা। টিএসপির ৫০ কেজির বস্তা এক হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও কোথাও কোথাও তিন হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। আর এক হাজার ৫০ টাকা দামের ডিএপি সার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকায়।
ফসলের ক্ষতি এড়াতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে সার কিনছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
দারুসা বাজারের ডিলার জীবন কুমার অবশ্য বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় তিনি সব কৃষককে প্রয়োজন অনুযায়ী সার দিতে পারছেন না। তাঁর দাবি, তিনি ২০ টন সার বরাদ্দ পেয়েছেন এবং ডিএপি এসেছে মাত্র ৬৬ বস্তা। বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সেপ্টেম্বরের বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ
রাজশাহী জেলায় কৃষকের সংখ্যা প্রায় চার লাখ ১২ হাজার। তাদের জন্য সেপ্টেম্বর মাসে টিএসপি বরাদ্দ হয়েছে এক হাজার ৪৫ টন। হিসাব অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা করে টিএসপি দেওয়া সম্ভব হবে মাত্র ২০ হাজার ৯০০ কৃষককে। আবার জেলার সব কৃষকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করলে একজন কৃষকের ভাগে পড়বে আনুমানিক আড়াই কেজি টিএসপি।
একইভাবে প্রত্যেক কৃষকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করলে এমওপি প্রায় চার কেজি এবং ডিএপি প্রায় সাত কেজি করে পড়বে। ফলে কৃষকের প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে বরাদ্দের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ সার ব্যবসায়ী সমিতির রাজশাহী জেলা ইউনিটের নেতারা বলছেন, সরকারি গুদামে সার মজুত নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই। সরকারি গুদামগুলোতে সার থাকলেও কৃষকের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় ডিলার পর্যায়ে চাপ তৈরি হয়েছে।
রোববার নগরীর রেলগেট এলাকায় সংগঠনটির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা সভাপতি মো. ওসমান আলী লিখিত বক্তব্যে বলেন, রাজশাহীর বাফার ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকের চাহিদা এবং সরকারি বরাদ্দের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় বিতরণ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
এক লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর জমি
রাজশাহী জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর। সেপ্টেম্বর মাসের জন্য জেলায় টিএসপি বরাদ্দ হয়েছে এক হাজার ৪৫ টন, এমওপি এক হাজার ৬২৯ টন এবং ডিএপি তিন হাজার ১৫ টন।
ডিলারদের সংগঠন বলছে, জমির পরিমাণ এবং কৃষকের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এসব সারের বরাদ্দ পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। সংকটপূর্ণ এলাকায় দ্রুত অতিরিক্ত বরাদ্দ পাঠানোর দাবিও জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ বাড়ানো, সংকটপূর্ণ এলাকায় দ্রুত অতিরিক্ত সার পাঠানো, মাছ চাষের পুকুরের জন্য আলাদা সার বরাদ্দ, ডিলারদের কমিশন পুনর্নির্ধারণ এবং কৃষকদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সার ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া।
ডিলার ও কৃষকদের ভিন্ন দাবি
রাজশাহীতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ৮৬ জন এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ১৩০ জনসহ মোট ২১৬ জন সার ডিলার রয়েছেন। পাশাপাশি কার্ডধারী খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন ৪৭৫ জন।
ডিলারদের দাবি, তারা সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন করে নির্ধারিত দামে বিক্রি করছেন। কোনো ডিলার অনিয়ম করলে তার দায় সবার ওপর চাপানো ঠিক নয়। তাদের আরও অভিযোগ, কিছু কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় আগে সার কিনে মজুত করছেন। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের আলু ও পেঁয়াজ চাষের জন্য আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতা তৈরি হওয়ায় বর্তমান সময়ে চাহিদা বেড়েছে।
ডিলারদের আরেকটি দাবি, অনেক কৃষক কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সার ব্যবহার না করে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রয়োগ করছেন। এতে বাজারে সারের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি জমির উর্বরতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই কৃষকদের সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
মাছের পুকুরের জন্যও বরাদ্দের দাবি
বাংলাদেশ সার ব্যবসায়ী সমিতির রাজশাহী জেলা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর পুকুরে মাছ চাষ করা হয়। এসব জলাশয়ের জন্যও আলাদা সার বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা।
ডিলাররা জানান, নির্ধারিত মূল্যেই সার বিক্রি করতে তারা আগ্রহী। বর্তমানে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপির দাম এক হাজার ৩৫০ টাকা করে নির্ধারিত রয়েছে। ডিএপির দাম এক হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপির দাম এক হাজার টাকা।
অন্যদিকে কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের গুদামে গিয়েও অনেক সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো গুদাম বন্ধ থাকার কথাও জানিয়েছেন তারা। খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে সার দোকানে না রেখে অন্যত্র মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও উঠেছে। তাদের দাবি, বেশি দাম দিতে রাজি হলেই কোথাও কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের ব্যাখ্যা
সারের সংকট নিয়ে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, জেলার মোট কৃষকের সবাই আমন চাষ করেন কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁর দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার বেশি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, যদি অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হয়, তাহলে কৃষি বিভাগ নতুন করে চাহিদা পাঠাবে। ইতোমধ্যে বেশি সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমন ধানের বর্তমান পর্যায়ে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন বেশি। টিএসপি ও ডিএপি এখন একই মাত্রায় প্রয়োজন হয় না। তাঁর মতে, অনেক কৃষক আগাম আলু ও পেঁয়াজ চাষের জন্য সার সংগ্রহ করায় বাজারে চাহিদা বেশি বলে মনে হচ্ছে।
ফলে রাজশাহীতে প্রকৃতপক্ষে সারের ঘাটতি রয়েছে কি না, নাকি বরাদ্দ, বিতরণ এবং আগাম মজুতের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে চাপ তৈরি হয়েছে—এ নিয়ে কৃষক, ডিলার ও কৃষি বিভাগের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে নির্ধারিত দামে কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় সার পৌঁছানোই এখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



