রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার আশ্বাস দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। রোববার রাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ এক বিজ্ঞপ্তিতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানায়।
কমিটিতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি এ. বি. এম. ইজাজুল কবির রুয়েল ও মনজুরুল আলম রিয়াদকে সদস্য করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের নির্দেশনায় গঠিত কমিটিকে ঘটনার বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করে কেন্দ্রীয় সংসনের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে সাংবাদিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আব্দুল আলিম বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই তাঁরা ঘটনাস্থলে যান এবং সেখানে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শোনেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে রাবি শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরোধের সূত্রপাত হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামলায় চার সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফ উজ্জামান কোরবান, দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল এবং দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু। আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামও গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁর মাথায় আঘাত লেগে রক্তাক্ত জখম হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া আরও ১০ জনের বেশি সাংবাদিক আহত হয়েছেন। আহত সাংবাদিকদের কয়েকজন বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথির বিরুদ্ধে। তাঁদের সঙ্গে আরও ৮ থেকে ১০ জন নেতাকর্মী হামলায় অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোববার রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের গেটে আসেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এ সময় তাঁদের হাতে বস্তাভর্তি দেশীয় অস্ত্র ছিল। এর মধ্যে রামদা, চাপাতি, হকি স্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাটসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দেখা যায় বলে তাঁরা দাবি করেন। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ঘটনাস্থলে গেলে অস্ত্রগুলো সরিয়ে বা লুকিয়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর হলের সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অবস্থান ও অস্ত্র হাতে থাকার দৃশ্য ভিডিও করতে এগিয়ে যান দৈনিক সমকাল ও আজকের পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, প্রক্টরের উপস্থিতিতেই সমকালের প্রতিনিধিকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। একই সময় আজকের পত্রিকার প্রতিনিধির মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
একপর্যায়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধিকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাংবাদিকদের হলের ভেতরে নিয়ে যান প্রক্টর এবং পরে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের মধ্যেও কয়েকজন হামলার শিকার হন। এ সময় দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল এবং আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলায় জাহিদুল ইসলামের মাথা ফেটে যায়।
সহকর্মীদের রক্ষা করতে অন্য সাংবাদিকরা এগিয়ে এলে তাঁদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের ‘পুঁতে ফেলার’ হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ঘটনার পর সাংবাদিকরা হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ নিজেদের সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করেছে।
এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মামলা ও ছাত্রদলের তদন্ত—দুই প্রক্রিয়ার ফলাফলের দিকে নজর রয়েছে। তদন্তে হামলার প্রকৃত কারণ, কারা এতে সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা অবশ্য সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।


