বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও এর পরিকল্পনা ও জমি প্রস্তুতের কাজ কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছিল বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। তাঁর ভাষ্য, রামপালে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগটি আগের সরকারের সময়েই নেওয়া হয়েছিল এবং এতে সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনাও ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নসরুল হামিদ বলেন, রামপালের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে তাঁর দায়িত্ব পালনকালে সৌদি আরবের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান একোয়া পাওয়ারের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তাঁর দাবি, প্রকল্পটি বর্তমান সময়ে নতুন করে শুরু হওয়া কোনো উদ্যোগ নয়; বরং কয়েক বছর ধরে চলা পরিকল্পনারই পরবর্তী ধাপ।
সাবেক প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ইসা-বিন ইউসুফ আল দাহিলান তাঁর কার্যালয়ে যান। সেখানে একোয়া পাওয়ারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রদূতের ওই সফরের আগেই বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট সৌদি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা চলছিল।
পরিকল্পনাটি ছিল বড় পরিসরের। একোয়া পাওয়ার বাংলাদেশে মোট ১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে—এমন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন নসরুল হামিদ। এর আওতায় বাগেরহাটের রামপালে ৫০০ মেগাওয়াট এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে আরও ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কথা ছিল। প্রয়োজনীয় জমির ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ওপর থাকার কথা জানানো হয়েছিল।
এই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের ২৮ নভেম্বর একোয়া পাওয়ার ও বিপিডিবির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যায়। নসরুল হামিদের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে সরকারের নেগোসিয়েশন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সবকিছু ঠিক থাকলে ওই বছরের শেষ নাগাদ প্রকল্পের কাজ শুরু করার পরিকল্পনাও ছিল বলে তিনি জানান।
তবে পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ৫ আগস্টের পর আগের সরকারের সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে চলা নেগোসিয়েশন বাতিল হয়ে যায়। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সেটিও আর বাস্তবায়িত হয়নি।
রামপালের জমি নিয়েও নসরুল হামিদ বলেছেন, বর্তমান প্রকল্পের জন্য জমি নতুন করে অধিগ্রহণের বিষয়টি পুরোপুরি নতুন নয়। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে বিপিডিবি রামপালে ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল। ওই জমির একটি অংশে পরে মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
অবশিষ্ট ব্লক-বি এলাকায়ও আগের সরকারের সময়ে কিছু অবকাঠামোগত প্রস্তুতির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জমি উন্নয়ন এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজও তখন করা হয়েছিল। ফলে বর্তমানে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদনকে তিনি আগের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।
তবে বর্তমান প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন কাঠামো আগের পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা অভিন্ন, সে বিষয়ে প্রকল্পের বিস্তারিত সরকারি নথি ও বাস্তবায়ন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আগের ৫০০ মেগাওয়াটের পরিকল্পনা থেকে বর্তমান ৪৪২ মেগাওয়াট প্রকল্পে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, অর্থায়নের কাঠামো কী এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি বিনিয়োগের কোনো সুযোগ থাকছে কি না—এসব বিষয় প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের পর আরও স্পষ্ট হবে।
নসরুল হামিদের বক্তব্যের মূল দাবি হলো, রামপালে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণা, জমি প্রস্তুত এবং বিদেশি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ আগের সরকারের সময়েই শুরু হয়েছিল। তাঁর মতে, একনেকের অনুমোদন পাওয়া বর্তমান প্রকল্পটি সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই পরিবর্তিত বা পরবর্তী রূপ।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর আলোচনা দীর্ঘদিনের। সৌরবিদ্যুৎ সেই লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রামপালের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতার চাপও কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটির চূড়ান্ত ব্যয়, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন সময়সূচি ও উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের অগ্রগতি নির্ভর করবে পরবর্তী প্রশাসনিক ও কারিগরি কার্যক্রমের ওপর।


