শ্রদ্ধাঞ্জলি-আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তির কথক-সৈয়দ মুজতবা আলী “বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয় না।”

বাংলা সাহিত্যের পাঠকসমাজে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের পরিচয় শুধু লেখক হিসেবে দিলে তাঁদের প্রতি অবিচার করা হয়। তাঁরা একাধারে সাহিত্যিক, পণ্ডিত, ভাষাবিদ, ভ্রমণকারী, রসিক ও জীবনদ্রষ্টা। সৈয়দ মুজতবা আলী তেমনই এক বিরল প্রতিভা—যাঁর কলমে পাণ্ডিত্য পেয়েছে রসের স্বাদ, ভ্রমণ পেয়েছে মানবিকতার স্পর্শ, আর হাস্যরস হয়ে উঠেছে জীবনকে গভীরভাবে দেখার এক অনন্য শিল্প।

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মবার্ষিকী।
এই অসামান্য সাহিত্যপ্রতিভার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

জন্ম ও শৈশব

সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪ সালে, তৎকালীন শ্রীহট্ট জেলার করিমগঞ্জে। তাঁর পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মাতা সৈয়দ আয়তুল মান্নান খাতুন। চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়।

শৈশব থেকেই জ্ঞান ও ভাষার প্রতি তাঁর ছিল অসাধারণ আকর্ষণ। পরবর্তী জীবনে পৃথিবীর নানা দেশ, নানা সংস্কৃতি ও নানা ভাষার সংস্পর্শ তাঁকে করে তুলেছিল এক বিশ্বমনস্ক বাঙালি—যাঁর চিন্তার পরিধি ছিল ভৌগোলিক সীমারেখার অনেক ঊর্ধ্বে।

জ্ঞানের সন্ধানে বিশ্বপরিক্রমা

শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালে তিনি রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার আদর্শ এবং বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষার পরিবেশের সংস্পর্শ লাভ করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে।

জার্মানির বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে ১৯৩২ সালে ডক্টর অব ফিলসফি (ডি-ফিল) ডিগ্রি অর্জন করেন। মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন।

তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল বিস্ময়কর। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, গুজরাটি, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়সহ বহু ভাষায় তাঁর ছিল অসাধারণ দখল। ভাষা তাঁর কাছে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না—ছিল বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির দরজা খোলার চাবি।

কর্মজীবনের বৈচিত্র্য

সৈয়দ মুজতবা আলীর কর্মজীবনও তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের মতোই বৈচিত্র্যময়। কাবুলের কৃষিবিজ্ঞান কলেজে ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার প্রভাষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। পরে বরোদা কলেজ, বগুড়া আজিজুল হক কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স ও অল ইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে বিশ্বভারতীতে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন।

‘দেশে-বিদেশে’—এক নতুন দিগন্ত

বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ মুজতবা আলীর আবির্ভাব যেন এক নতুন বাতাসের প্রবেশ। তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘দেশে-বিদেশে’ তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। কাবুলে অবস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা এই গ্রন্থে আফগানিস্তানের সমাজ, মানুষ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জীবনযাত্রা এমন প্রাণবন্তভাবে উঠে এসেছে যে পাঠকের কাছে বইটি নিছক ভ্রমণকাহিনি হয়ে থাকেনি—হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত মানবিক দলিল।

আবদুর রহমান, অধ্যাপক বেনওয়া, আহমদ আলী, খুদাবখশ, বগদানফ, মুইন-উস-সুলতান—এসব চরিত্র আজও বাংলা সাহিত্যের পাঠকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—অচেনা দেশকে পরিচিত করে তোলা এবং অপরিচিত মানুষকে আপন করে নেওয়া।

রম্যরসের আড়ালে গভীর জীবনবোধ

সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা প্রধানত রম্যলেখক হিসেবে চিনি। কিন্তু তাঁর রম্যরচনা নিছক হাসানোর জন্য নয়। তাঁর হাসির আড়ালে থাকে জীবনবোধ, ব্যঙ্গের অন্তরালে থাকে সত্য, আর কৌতুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকে মানুষের প্রতি গভীর মমতা।

‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’, ‘চাচা-কাহিনী’, ‘টুনি মেম’, ‘ধূপছায়া’, ‘ভবঘুরে ও অন্যান্য’ প্রভৃতি রচনায় তাঁর অনন্য রসবোধ ও ভাষাশৈলীর পরিচয় পাওয়া যায়।

তাঁর রচনার হাসি কখনো নির্মল, কখনো তীক্ষ্ণ; কখনো মৃদু ব্যঙ্গ, কখনো গভীর জীবনদর্শন। তাই পাঠক হাসতে হাসতেই হঠাৎ থেমে ভাবতে বাধ্য হন—এই তো জীবনেরই কোনো এক চিরন্তন সত্য!

উপন্যাস ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম

রম্যরচনার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘অবিশ্বাস্য’, ‘শবনম’, ‘শহর ইয়ার’ ও ‘তুলনাহীনা’।

‘শবনম’-এ আফগান সমাজের পটভূমিতে প্রেম ও মানবিক সম্পর্কের এক বেদনাময় কাহিনি উঠে এসেছে। আর ‘চাচা-কাহিনী’, ‘রসগোল্লা’, ‘তীর্থহীন’, ‘পাদটীকা’, ‘রাক্ষসী’ প্রভৃতি রচনায় তাঁর গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে।

তাঁর ‘জলে-ডাঙায়’, *‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’*সহ অন্যান্য গ্রন্থেও তাঁর গভীর মনন, ভাষাজ্ঞান ও সমাজ-সচেতনতার পরিচয় মেলে।

একজন বিশ্বমানবিক বাঙালি

সৈয়দ মুজতবা আলীর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত তাঁর অসাম্প্রদায়িক, উদার ও বিশ্বমানবিক চেতনা।

তিনি ধর্মকে জানতেন গভীরভাবে, কিন্তু ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম, ভারত ও ইউরোপ, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জানার চেষ্টা করেছেন গভীর কৌতূহল ও মুক্তবুদ্ধি দিয়ে।

তাঁর সাহিত্য তাই কোনো সংকীর্ণ ভূগোলের সাহিত্য নয়। সেখানে আফগানিস্তান আছে, জার্মানি আছে, ভারত আছে, ইউরোপ আছে—কিন্তু সর্বত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষ।

পাণ্ডিত্য যখন রসিকতার পোশাক পরে

তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য নিয়ে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত। গীতা থেকে শুরু করে সংস্কৃত সাহিত্য, ইসলামী ধর্মতত্ত্ব থেকে ইউরোপীয় দর্শন—বহু বিষয়ে তাঁর ছিল বিস্ময়কর জ্ঞান। কিন্তু এই বিপুল পাণ্ডিত্য কখনো তাঁর লেখাকে ভারী করে তোলেনি।

বরং তিনি পাণ্ডিত্যকে এমন সরস ও সহজ ভাষায় পরিবেশন করেছেন যে পাঠক কখনো টেরই পান না—কখন তিনি গল্প পড়ছেন আর কখন জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

এই কারণেই সৈয়দ মুজতবা আলী শুধু একজন রম্যলেখক নন; তিনি বাংলা ভাষার এক অনন্য বুদ্ধিদীপ্ত কথক।

কেন তিনি কিংবদন্তি?

সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মূল্যায়নের সারকথা—সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন।

কিংবদন্তি হওয়ার জন্য কখনো কখনো শতাব্দী পেরিয়ে যেতে হয়। কিন্তু মুজতবা আলীর ক্ষেত্রে তা ঘটেছিল তাঁর জীবদ্দশাতেই। কারণ তিনি শুধু লিখতেন না—বলতেন। তাঁর গল্প যেন পাঠকের সামনে বসে বলা গল্প; তাঁর চরিত্রগুলো যেন আমাদের পরিচিত মানুষ; তাঁর হাসি যেন আমাদের নিজেদের জীবনের হাসি-কান্নারই প্রতিধ্বনি।

তাঁর ভাষা ছিল সরস, মার্জিত, বুদ্ধিদীপ্ত ও বহুসাংস্কৃতিক। আর তাঁর সাহিত্য ছিল মানুষের প্রতি গভীর বিশ্বাসে উজ্জ্বল।

কিছু অমর উচ্চারণ

“জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়ে মহত্তর।”

“বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয় না।”

আর তাঁর বহুল উদ্ধৃত আরেকটি ভাবনা যেন বই ও জ্ঞানের প্রতি তাঁর আজীবন ভালোবাসারই প্রতিচ্ছবি—

রুটি-মদ একদিন ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়জনের চোখও একদিন ঝাপসা হয়ে আসবে; কিন্তু একটি ভালো বই তার যৌবন ধরে রাখে।

এই কথাগুলো শুধু উক্তি নয়—এ যেন মুজতবা আলীর জীবনদর্শনেরই সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আনন্দ পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন। তাঁর সাহিত্যিক অবদানের জন্য তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

তবে সত্যিকার অর্থে তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার তাঁর অগণিত পাঠক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর বই হাতে নিয়ে হাসছে, ভাবছে, নতুন পৃথিবীকে চিনছে—এটাই হয়তো একজন লেখকের সবচেয়ে বড় অর্জন।

শেষ কথা

সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন এমন একজন সাহিত্যিক, যিনি পৃথিবীকে দেখেছেন বহু জানালা দিয়ে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছেন মানুষের কাছেই।

তিনি হাসিয়েছেন, আবার ভাবিয়েছেন।
তিনি ভ্রমণ করিয়েছেন, আবার নিজের ভেতরেও ফিরিয়ে এনেছেন।
তিনি জ্ঞান দিয়েছেন, কিন্তু কখনো জ্ঞানের ভার চাপিয়ে দেননি।
তিনি ধর্মকে জেনেছেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার দেয়াল মানেননি।
তিনি বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন বিশ্বের বহু ভাষা ও সংস্কৃতির রস এনে।

১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে তাঁর নশ্বর জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু একজন সত্যিকারের সাহিত্যিকের মৃত্যু হয় না।

সৈয়দ মুজতবা আলী আজও বেঁচে আছেন তাঁর ‘দেশে-বিদেশে’র কাবুলে, ‘চাচা-কাহিনী’র হাসিতে, ‘শবনম’-এর বেদনায়, তাঁর অমর রম্যরচনার বুদ্ধিদীপ্ততায় এবং অগণিত পাঠকের হৃদয়ে।

যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে,
যতদিন বাঙালি বই পড়বে,
যতদিন মানুষ হাসতে হাসতে নিজের জীবনকে নতুন করে চিনবে—
ততদিন সৈয়দ মুজতবা আলীও বেঁচে থাকবেন তাঁর অনন্য সাহিত্য-সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।

জন্মবার্ষিকীতে কিংবদন্তির এই কথাশিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়
সৈয়দ মুজতবা আলী।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।