শ্রমিক বিক্ষোভে কোনাবাড়ি-চন্দ্রার সব পোশাক কারখানায় ছুটি

গাজীপুরের কোনাবাড়ি থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার এলাকার সব পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতন নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় শনিবার (৩১ অক্টোবর) এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দুপুরের পর চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শ্রমিকদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং কারখানার সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে। পরে কোনাবাড়ি থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত পুরো এলাকার পোশাক কারখানাগুলোতে ছুটি কার্যকর করা হয়। এতে শিল্পাঞ্চলটির স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

পুলিশ ও শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরের পর কয়েকটি কারখানার শ্রমিক নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ না দিয়ে বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। প্রথমে চন্দ্রা এলাকার ইন্টারস্টপ কারখানার সামনে শ্রমিকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের প্রধান দাবি, তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে।

শুরুতে একটি কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে আশপাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা কারখানার সামনে থেকে বেরিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে।

মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তিতে যাত্রীরা

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল করে। ফলে চন্দ্রা এলাকায় মহাসড়ক অবরোধের প্রভাব দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে সড়কের উভয় পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।

শিল্পাঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মজীবী মানুষের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। একই সঙ্গে কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণার কারণে শ্রমিকদের মধ্যে কর্মস্থল ছেড়ে বাড়ি ফেরার তৎপরতা দেখা দেয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের চেষ্টা

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, শনিবার দুপুরের পর কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিক তাঁদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে সড়কে নেমেছেন। তাঁদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কোনো সমাধান না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শুধু উৎপাদন কার্যক্রম নয়, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পোশাকশিল্পের মতো রপ্তানিনির্ভর খাতে দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে কারখানার কার্যাদেশ বাস্তবায়ন ও পণ্য সরবরাহের সময়সূচিতে চাপ তৈরি হতে পারে।

আশুলিয়াতেও শ্রমিক বিক্ষোভ, আহত শিল্প পুলিশ সদস্য

এদিকে গাজীপুরের পাশাপাশি ঢাকার সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে শনিবার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন।

বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে শিল্প পুলিশের একজন সদস্য আহত হন।

আশুলিয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা—দুইয়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি

গাজীপুর ও আশুলিয়ায় শ্রমিকদের বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে মাসিক ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি। এর পাশাপাশি শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিও সামনে এসেছে।

তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। এ শিল্পে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মরত। তাঁদের মজুরি, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত শিল্পাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচের বিষয়গুলোও জড়িত। অন্যদিকে কারখানার মালিকদের উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়।

এ অবস্থায় শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে শিল্পাঞ্চলে কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

শনিবারের ঘটনায় গাজীপুরের কোনাবাড়ি-চন্দ্রা এলাকার সব পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা এবং আশুলিয়ায় বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।