লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে রানবন্যার রোমাঞ্চকর ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ৩ উইকেটে হারিয়ে ঘরের মাঠে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে পাকিস্তান। কামিন্দু মেন্ডিসের অনবদ্য সেঞ্চুরির ওপর ভর করে শ্রীলঙ্কার দেওয়া ৩২৬ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৯ বল বাকি থাকতেই অবিস্মরণীয় জয় ছিনিয়ে নেয় আয়োজকরা। পাকিস্তানের এই ঐতিহাসিক জয়ের মূল নায়ক ওপেনার ফখর জামান, যিনি দায়িত্বশীল ও আগ্রাসী ১২৭ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস উপহার দেন।
শনিবার হাইভোল্টেজ এই ফাইনালে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয় শ্রীলঙ্কা। উদ্বোধনী জুটিতে ওপেনার আভিস্কা ফার্নান্দো ও কামিন্দু মেন্ডিস ৮৭ রান যোগ করে দলকে দারুণ এক ভিত্তি এনে দেন। আভিস্কা ৪৯ বলে ৩টি চার ও ১টি ছক্কায় ৩৮ রান করে আউট হওয়ার পর কুশাল মেন্ডিসও দ্রুত ফিরে যান। তবে তৃতীয় উইকেটে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন কামিন্দু মেন্ডিস ও পবন রত্নায়েক। এই দুই ব্যাটার ১১১৯ বলে ১৪৬ রানের বিধ্বংসী এক জুটি গড়েন।
ক্যারিয়ারের ৩৭তম ওয়ানডে খেলতে নেমে কামিন্দু মেন্ডিস তুলে নেন চোখধাঁধানো প্রথম সেঞ্চুরি। ৪১.১ ওভারে দলীয় ২৫৫ রানে আউট হওয়ার আগে ১২৮ বলে ১২টি চার ও ২টি ছক্কায় ১৩১ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন তিনি। অন্যদিকে পবন রত্নায়েক ৬৫ বলে ৮টি দৃষ্টিনন্দন ছক্কার সাহায্যে ৭৭ রানের তাণ্ডব চালান। শেষ দিকে লঙ্কান ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিল শুরু হলেও নির্ধারিত ওভারে ৮ উইকেটে ৩২৫ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায় সফরকারীরা। পাকিস্তানের পক্ষে শাহিন শাহ আফ্রিদি, হারিস রউফ, নাসিম শাহ ও অফ স্পিনার সালমান আলি আগা প্রত্যেকে ২টি করে উইকেট শিকার করেন।
৩২৬ রানের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে নেমে পাকিস্তান শুরুতেই চরম বিপর্যয়ে পড়ে। দলীয় মাত্র ১৪ রানের মাথায় দুই টপ অর্ডার ব্যাটারকে হারিয়ে চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা। সেখান থেকে দলকে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে টেনে তোলেন ওপেনার ফখর জামান ও তরুণ সাদ বেগ। তৃতীয় উইকেটে এই দুজন ১৪০ বলে ১৪৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। সাদ বেগ ৭৫ বলে ১১টি বাউন্ডারিতে ৭৪ রান করে বিদায় নেন।
এরপর সালমান আলি আগাকে সাথে নিয়ে ফখর জামান ৪১ বলে ৫৭ রান যোগ করেন। এক পর্যায়ে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ২২০ রান। সেখান থেকে মাত্র ১০ রানের ব্যবধানে সেট ব্যাটার ফখর জামান ও সালমান দুজনই সাজঘরে ফিরলে ম্যাচ আবার নাটকীয় মোড় নেয়। ফখর জামান ৯৯ বলে ১১টি চার ও ৬টি ছক্কায় মারকুটে ১২৭ রান করেন।
বিপদের মুখে হাল ধরেন আরাফাত মিনহাস ও হাসান নওয়াজ। মাত্র ৬৫ বলে ৯৪ রানের চোখধাঁধানো জুটি গড়ে দলকে জয়ের দুয়ারে নিয়ে যান তাঁরা। আরাফাত ৩১ বলে ৩টি চার ও ৪টি ছক্কায় ৬১ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলেন এবং হাসান নওয়াজ ৪৫ বলে ৩৭ রানে অপরাজিত থাকেন। জয়ের জন্য যখন ১৫ বলে মাত্র ২ রান প্রয়োজন, তখন টানা দুই বলে দুই উইকেট হারিয়ে আবার উত্তেজনার পারদ চড়ে। অবশেষে ক্রিজে এসে শাহিন শাহ আফ্রিদি হাঁকান এক বিশাল ছক্কা, আর তাতেই ৩ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় নিশ্চিত হয় পাকিস্তানের।
উল্লেখ্য, লাহোরে অনুষ্ঠিত এই ত্রিদেশীয় সিরিজের তৃতীয় দল ছিল ইংল্যান্ড। পুরো সফরে ইংলিশরা চার ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে জয় পায়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪২৯ রান তুলে ম্যাচ হেরে যাওয়ার এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখিও হতে হয়েছিল তাদের।
ফাইনালে খেলোয়াড়দের মূল পারফরম্যান্সের সারসংক্ষেপ
| খেলোয়াড় / পারফর্মার | দল | পারফরম্যান্সের ক্যাটাগরি | পারফরম্যান্স ও অবদান |
|---|---|---|---|
| কামিন্দু মেন্ডিস | শ্রীলঙ্কা | সেঞ্চুরি | ১৩১ রান (১২৮ বল, ১২টি চার, ২ টি ছক্কা) |
| পবন রত্নায়েক | শ্রীলঙ্কা | হাফ-সেঞ্চুরি | ৭৭ রান (৬৫ বল, ৮টি ছক্কা) |
| আভিস্কা ফার্নান্দো | শ্রীলঙ্কা | ওপেনিং ইনিংস | ৩৮ রান (৪৯ বল, ৩টি চার, ১টি ছক্কা) |
| কুশাল মেন্ডিস | শ্রীলঙ্কা | মিডল অর্ডার | ২২ রানের জুটিতে অবদান |
| ফখর জামান | পাকিস্তান | ম্যাচজয়ী সেঞ্চুরি | ১২৭ রান (৯৯ বল, ১১টি চার, ৬টি ছক্কা) |
| সাদ বেগ | পাকিস্তান | হাফ-সেঞ্চুরি | ৭৪ রান (৭৫ বল, ১১টি চার) |
| আরাফাত মিনহাস | পাকিস্তান | ক্যামিও ফিফটি | ৬১ রান (৩১ বল, ৩টি চার, ৪টি ছক্কা) |
| হাসান নওয়াজ | পাকিস্তান | অপরাজিত ব্যাটিং | ৩৭* রান (৪৫ বল, অপরাজিত ফিনিশার) |
| শাহিন শাহ আফ্রিদি | পাকিস্তান | পেস বোলিং & ফিনিশিং | ২ উইকেট ও জয়সূচক ছক্কা |
| হারিস রউফ | পাকিস্তান | পেস বোলিং | ২ উইকেট (মিডল অর্ডার ব্রেকথ্রু) |
| নাসিম শাহ | পাকিস্তান | পেস বোলিং | ২ উইকেট (নিয়ন্ত্রিত বোলিং স্পেল) |
| সালমান আলি আগা | পাকিস্তান | অলরাউন্ড অল-আউট | ২ উইকেট এবং ৪১ বলে ৫৭ রানের জুটি |


