হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে স্বর্ণালংকার কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়ে শাশুড়ি জাহানারা বেগমকে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে জামাতা মো. অলিউর রহমান অলিকে (৪২) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক কাঁকন দে জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত অলিউর রহমান অলি মাধবপুর উপজেলার তুলশীপুর (অলিপুর) গ্রামের মো. ইউনুছ আলীর ছেলে। রায় ঘোষণার সময় আসামিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে হাজির করা হয় এবং রায় প্রদান শেষে সাজা পরোয়ানা মূলে তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতের স্টেনোগ্রাফার মো. মুখলেছুর রহমান রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার নথি ও এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৯ মে সকালে স্বর্ণালংকার কেনাকাটার কথা বলে শাশুড়ি জাহানারা বেগমকে নিজ বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান জামাতা অলিউর রহমান। এর পর থেকে জাহানারা বেগমের আর কোনো খোঁজ মিলছিল না। পরিবার ও স্বজনেরা বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। নিখোঁজের তিন দিন পর, ১ জুন সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ওয়াচ টাওয়ারের দক্ষিণ পাশের এক নির্জন বেতবাগান থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করে চুনারুঘাট থানা পুলিশ।
পরদিন বিভিন্ন সংবাদপত্রে অজ্ঞাত নারীর লাশ উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হলে তা নজর কাড়ে স্বজনদের। পত্রিকায় ছাপা হওয়া সংবাদের বর্ণনা ও পোশাক দেখে নিহত নারীর ছেলে মো. মিজানুর রহমান চুনারুঘাট থানায় গিয়ে উদ্ধার করা মরদেহটি তার নিখোঁজ মা জাহানারা বেগমের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনার পর নিহতের ছেলে মিজানুর রহমান বাদী হয়ে বোনজামাই অলিউর রহমান অলিকে একমাত্র আসামি করে চুনারুঘাট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার আদ্যোপান্ত তদন্ত শেষে চুনারুঘাট থানা পুলিশ ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি আদালতে আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে।
দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামির অপরাধ প্রমাণে আদালতে ১৬ জন সাক্ষীকে উপস্থাপন করে। সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হওয়ার পর আদালত মামলাটি রায়ের জন্য নির্ধারণ করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মো. গুলজার আহমেদ খান জানান, এটি মূলত কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকা একটি ‘ক্লুলেস’ বা সূত্রহীন হত্যাকাণ্ড ছিল। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ আসামির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত প্রমাণের মধ্যে ছিল আসামির মাধ্যমে শাশুড়িকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, আদালতে আসামির নিজের দেওয়া স্বেচ্ছামূলক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ঘটনার সময় দুজনের একই স্থানে অবস্থান নির্দেশক কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) এবং পরবর্তীতে লাশ থেকে সংগৃহীত ডিএনএ পরীক্ষার ইতিবাচক ফলাফল। এসব অখণ্ডনীয় দাপ্তরিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বিচারক আসামি অলিউর রহমানকে দোষী সাব্যস্ত করে এই সাজা প্রদান করেন।


