আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচ হিসেবে লিওনেল স্কালোনির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর তিন মাসের কিছু বেশি সময় বাকি থাকলেও এখনো নতুন চুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। বিশ্বকাপজয়ী কোচকে ধরে রাখতে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) আগ্রহী হলেও স্কালোনির নিজের অবস্থানই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেডিও লা রেডের অনুষ্ঠান ‘উন বুয়েন মোমেন্তো’-তে সাংবাদিক গুস্তাভো ইয়ারোচ জানিয়েছেন, এএফএ স্কালোনিকে দায়িত্বে রাখার ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছে। নতুন চুক্তির প্রস্তাব দেওয়ার ইচ্ছাও তাদের রয়েছে। কিন্তু স্কালোনির সামনে রয়েছে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা, যা নতুন চুক্তির পথে জটিলতা তৈরি করছে।
দীর্ঘ সময়ের দায়িত্বে মানসিক ক্লান্তি
স্কালোনির সংশয়ের প্রথম কারণটি সরাসরি তার দীর্ঘ কোচিং অধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর্জেন্টিনা দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় আট বছর ধরে একই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি। এই সময়ে দলকে পুনর্গঠন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাফল্য এনে দিয়েছেন।
এখন সামনে অপেক্ষা করছে নতুন একটি চক্র। দলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে জাতীয় দলের কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অর্থাৎ, আগের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে চলার সুযোগ নেই; আবারও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে স্কালোনি নিজেই ভাবছেন, এত দীর্ঘ ও কঠিন একটি প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় শক্তি, আগ্রহ এবং মানসিক প্রেরণা তার মধ্যে এখনও আছে কি না। প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিরতিতে দল প্রস্তুত করা, খেলোয়াড়দের নিয়ে পরিকল্পনা করা এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার জন্য যে পরিমাণ মনোযোগ প্রয়োজন, দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর সেটি তার জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক হবে, সেটিও বিবেচনায় আসছে।
বোনাসের অর্থ নিয়ে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ
স্কালোনির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় মাঠের বাইরের আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ এবং খেলোয়াড়দের বোনাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও পরিশোধ করা হয়নি।
এই বকেয়া নিয়ে জাতীয় দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক সাফল্যের পর এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০২১ সালের পর থেকে আর্জেন্টিনা আন্তর্জাতিক ফুটবলে একের পর এক বড় সাফল্য পেয়েছে। ফলে জাতীয় দলকে ঘিরে আর্থিক কার্যক্রমও আগের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে খেলোয়াড় ও স্টাফদের প্রাপ্য অর্থ সময়মতো পরিশোধ না হওয়া স্কালোনির জন্যও অস্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রীতি ম্যাচের পরিকল্পনাতেও অসন্তোষ
তৃতীয় কারণটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের আয়োজন ও প্রতিপক্ষ নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বকাপের আগে থেকেই স্কালোনি এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। তার চাওয়া ছিল, প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে এমন দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়া, যারা আর্জেন্টিনাকে বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ফেলতে পারে।
কারণ শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেললে খেলোয়াড়দের পরীক্ষা করার পাশাপাশি কৌশলগত দুর্বলতাও চিহ্নিত করা যায়। বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আগে এমন ম্যাচ দলের প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এএফএ সবসময় স্কালোনির পছন্দ অনুযায়ী শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নিশ্চিত করতে পারেনি। অনেক সময় তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষে ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছে। এতে কোচের পরিকল্পনা এবং দলের প্রস্তুতির মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও একই ধরনের সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। চলতি মাসের শেষ দিকে ফিফা উইন্ডোতে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কারা হবে, তা আগেই ঘোষণা করার কথা ছিল। সপ্তাহের শুরুতে এএফএর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার প্রত্যাশা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে।
আরও বড় বিষয় হলো, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে যেসব দলের নাম বিবেচনায় রয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি স্কালোনির প্রত্যাশিত আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে স্কালোনির সামনে এখন শুধু নতুন চুক্তিতে সই করার প্রশ্ন নয়। দীর্ঘদিনের দায়িত্বের পর নতুন করে একই ধরনের মানসিক শক্তি নিয়ে কাজ করার প্রস্তুতি, বকেয়া অর্থ নিয়ে অসন্তোষ এবং দলের প্রস্তুতির জন্য উপযুক্ত প্রতিপক্ষ না পাওয়ার মতো বিষয়গুলোও তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। এএফএ তাকে ধরে রাখতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত স্কালোনি নিজে কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটিই এখন আর্জেন্টিনা ফুটবলের বড় আলোচনার বিষয়।


