স্মরণে অগ্নিযুগের বিপ্লবী শহীদ সঞ্জীবচন্দ্র রায়

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে যাঁরা দেশের মুক্তির স্বপ্ন বুকে ধারণ করে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সঞ্জীবচন্দ্র রায় তাঁদেরই একজন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রত্যয়ে তাঁর বিপ্লবী জীবন, কারাবরণ ও আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।

সঞ্জীবচন্দ্র রায় ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বিপ্লবী কর্মী ও অগ্নিযুগের শহীদ। তিনি ময়মনসিংহের বিপ্লবী সংগঠন সাধনা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অল্প বয়সেই তিনি দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছিল পরাধীন দেশকে মুক্ত করার স্বপ্ন।

১৮৮৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের এক কায়স্থ পল্লীতে তাঁর জন্ম। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে যখন তিনি যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গোপন বিপ্লবী সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেই উত্তাল সময়ের আবহে সঞ্জীবচন্দ্রও যুক্ত হন গুপ্ত বিপ্লবী আন্দোলনে। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, সাহস ও আত্মত্যাগের চেতনায় তিনি হয়ে ওঠেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের একজন নিবেদিত কর্মী।

১৯১৬ সালের এপ্রিল মাসে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় পুলিশ তাঁকে বাড়িতে না পেয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। পরে শহর থেকে দূরের এক প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রিভলভার ও গুলিসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অপরাধে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।

১৯১৬ সালের ১৩ জুলাই বিচারে তাঁর দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। কিন্তু কারাগারের অমানবিক পরিবেশ ও নির্মম নির্যাতন তাঁর জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ এই তরুণ বিপ্লবীকে দীর্ঘদিন কারাবাস ও নির্যাতনের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। শেষ পর্যন্ত কারাগারের সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে হার মানে তাঁর তরুণ প্রাণ। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই তাঁর জীবনের অবসান ঘটে।

কত স্বপ্ন, কত প্রত্যাশা আর কত সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর জীবন! অথচ দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মনিয়োগ করা সেই তরুণকে জীবনের পূর্ণ বিকাশের আগেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর এই অকালপ্রয়াণ শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়, পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত একটি জাতির ইতিহাসেও গভীর শোকের স্মারক।

সঞ্জীবচন্দ্র রায়ের মতো বিপ্লবীরা হয়তো তাঁদের জীবদ্দশায় স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ স্বাধীনতার সংগ্রামকে দিয়েছে সাহস, প্রেরণা ও অঙ্গীকার। তাঁদের রক্তে, ত্যাগে ও সংগ্রামে রচিত হয়েছে উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস।

আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি অগ্নিযুগের এই আত্মত্যাগী বিপ্লবীকে। শ্রদ্ধা জানাই তাঁর দেশপ্রেম, সাহস ও অদম্য স্বাধীনতাকামিতাকে।

সঞ্জীবচন্দ্র রায়—আপনার আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে থাকুক।

বিপ্লবী শহীদ সঞ্জীবচন্দ্র রায়ের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।