বাংলার মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও স্বদেশপ্রেমকে যিনি কবিতার পঙ্ক্তিতে, গানের কথায় আর গবেষণার গভীরতায় ধারণ করেছিলেন—ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ছিলেন তেমনই এক বহুমাত্রিক মননশীল মানুষ। তিনি ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক, অধ্যাপক এবং অসংখ্য কালজয়ী গানের গীতিকার। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভুবনে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
তাঁর লেখা ‘আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারা মন’ গানটি যেন তাঁর সমগ্র সৃষ্টিসত্তারই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। আব্দুল আহাদের সুরে গানটি বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেমের এক চিরসবুজ অনুভূতি হয়ে আছে।
স্বদেশের মাটি, সবুজ প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তাঁর গানের ভাষাকে করে তুলেছিল সহজ, সাবলীল অথচ অসামান্য আবেগঘন। তাঁর আরও জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’, *‘হলুদ বাটো মেন্দি বাটো’*সহ অসংখ্য গান। ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের গান রচনাতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
১৯৩৬ সালের ১৫ আগস্ট যশোর শহরের খড়কী পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা মোহাম্মদ শাহাদাত আলী এবং মাতা রাহেলা খাতুন। আট ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁরই সহোদর প্রখ্যাত গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান—বাংলা গীতিকাব্যের ভুবনে আরেক উজ্জ্বল নাম।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৯৫৩ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৫৫ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ভর্তি হয়ে ১৯৫৮ সালে স্নাতক এবং ১৯৫৯ সালে স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।
১৯৫৯ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। প্রথমে ফেলো হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৬২ সালে প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি গবেষণা ও সাহিত্যচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের School of Oriental and African Studies (SOAS)-এ পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণায় অংশ নেন।
১৯৭৫ সালে অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শিক্ষকতা, গবেষণা, সাহিত্য ও সংগীত—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ছিল স্বতন্ত্র ও দীপ্তিময়।
শুধু সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, দেশের সংকট ও মানুষের অধিকার প্রশ্নেও তিনি ছিলেন সচেতন ও দায়িত্বশীল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবস্থান ছিল বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার পক্ষে। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠীর রোষানলেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭২) এবং একুশে পদক (১৯৮৭)।
তাঁর স্ত্রী রাশিদা জামান। তাঁদের সংসারে রয়েছেন রুহিনা হাসমিন জামান করিম ও আসিফ জামান শুভ।
ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান চলে গেছেন অনেক বছর আগে। কিন্তু একজন সত্যিকারের কবি, গবেষক কিংবা গীতিকারের মৃত্যু হয় না তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু না হলে। তাঁর কবিতা, গবেষণা, সাহিত্যকর্ম এবং বিশেষ করে তাঁর দেশাত্মবোধক গান আজও আমাদের হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
যখনই বাংলার মাটির গন্ধে মন ভরে ওঠে, যখন সবুজের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর স্বদেশের জন্য এক অদ্ভুত ভালোবাসা জেগে ওঠে, তখনই মনে পড়ে তাঁর সেই অমর উচ্চারণ—
“আমার দেশের মাটির গন্ধে
ভরে আছে সারা মন…”
সত্যিই, এই মাটির গন্ধকে যিনি শব্দে, সুরে ও অনুভবে বেঁধে দিয়েছিলেন, তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকবেন।
৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ঢাকায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি
কবি, গীতিকার, গবেষক ও শিক্ষাবিদ
ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে।
তাঁর সৃষ্টির আলোয়, তাঁর স্বদেশপ্রেমের গানে—
তিনি বেঁচে থাকুন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।


