কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না—
মানুষের হৃদয়ের গোপন দরজায় কড়া নাড়ে।
কিছু সুর শুধু কানে পৌঁছায় না—
নিঃশব্দে এসে বসে থাকে মনের কোনো এক নির্জন কোণে।
আর কিছু শিল্পী চলে যাওয়ার পরও তাঁদের কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে বেড়ায়, পুরোনো দিনের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে, বুকের ভেতর অকারণে দীর্ঘশ্বাস নামায়।
নির্মলা মিশ্র ছিলেন তেমনই এক কণ্ঠের অধিকারী।
বাংলা গানের ভুবনে তাঁর কণ্ঠ ছিল এক অদ্ভুত মায়াময়তার নাম। সেখানে ছিল ভালোবাসার কোমলতা, বিরহের ব্যথা, অভিমানের নরম আঁচড়, আর ছিল হারিয়ে যাওয়া দিনের জন্য এক অনির্বচনীয় হাহাকার।
“এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না, যাতে মুক্তো আছে…”
এই একটি গানই যেন নির্মলা মিশ্রের কণ্ঠের সঙ্গে বাঙালির আবেগের এক অবিচ্ছেদ্য সেতুবন্ধন। গানটি শুনলেই মনে হয়—কেউ যেন বহুদিনের পুরোনো কোনো ব্যথার কথা খুব আস্তে করে বলে যাচ্ছে। সেই ব্যথা ব্যক্তিগত নয়, অথচ প্রত্যেকেরই নিজের বলে মনে হয়।
নির্মলা মিশ্র—একটি নাম, একটি কণ্ঠ, একটি দীর্ঘ সংগীতযাত্রা।
১৯৩৮ সালের ২ অক্টোবর, দুর্গাসপ্তমীর দিনে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার মজিলপুরে তাঁর জন্ম। পিতা পণ্ডিত মোহিনীমোহন মিশ্র, মাতা ভবানী দেবী। পিতার বদলির চাকরির কারণে পরবর্তীকালে তাঁদের পরিবার কলকাতার চেতলায় বসতি গড়ে।
সুর যেন তাঁর জীবনে বাইরে থেকে আসেনি—এসেছিল রক্তের ভেতর দিয়ে।
তাঁদের পরিবার ছিল সংগীতেরই এক নিবিড় আশ্রম। পিতা মোহিনীমোহন মিশ্র ছিলেন খ্যাতিমান গায়ক; বড় ভাই মুরারিমোহন মিশ্রও ছিলেন সংগীতশিল্পী। তাঁদের পারিবারিক পদবি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়; পরবর্তীকালে পরিবারটি ‘মিশ্র’ উপাধিতে পরিচিত হয়। সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁর পিতা কাশী সঙ্গীত সমাজের কাছ থেকে ‘পণ্ডিত’, ‘সঙ্গীত রত্ন’, ‘সঙ্গীত নায়ক’ প্রভৃতি সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
সেই সুরের সংসারেই ছোট্ট নির্মলার বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই সংগীত তাঁর কাছে কেবল বিনোদন ছিল না—ছিল জীবনযাপনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দক্ষিণ কলকাতার চেতলার মেয়ে নির্মলার ডাকনাম ছিল ‘ঝামেলা’। সঙ্গীতজগতের আপনজনেরা তাঁকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘ঝামেলাদি’ বলে। নামটির মধ্যে যেন ছিল তাঁর আপনজনদের স্নেহ, ঘনিষ্ঠতা আর একান্ত আপন করে পাওয়ার উষ্ণতা।
১৯৬০ সালে সঙ্গীত পরিচালক বালকৃষ্ণ দাসের ‘শ্রী লোকনাথ’ চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সংগীতজীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
একটির পর একটি গান এসে তাঁকে পৌঁছে দেয় বাঙালির ঘরে ঘরে।
‘এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’,
‘সেই একজন দিও না তাকে মন’,
‘আবেশে মুখ রেখে’,
‘বলো তো আর্শি’,
‘আমি তো তোমার হাসি কান্নার চিরদিনের সাথী’,
‘কাগজের ফুল বলে’,
‘ও তোতা পাখি রে’,
‘উন্মনা মন স্বপ্নে মগন’—
কত গান! কত স্মৃতি! কত প্রজন্মের ভালোবাসা!
তাঁর কণ্ঠে আধুনিক বাংলা গান যেন পেয়েছিল এক বিশেষ আবেগের ভাষা। সেই কণ্ঠ কখনো মৃদু বৃষ্টির মতো, কখনো গোধূলির বাতাসের মতো, কখনো আবার বুকের গভীরে জমে থাকা অপ্রকাশিত কষ্টের মতো শ্রোতার কাছে এসে ধরা দিয়েছে।
চলচ্চিত্রের গানেও তাঁর বিচরণ ছিল সমান উজ্জ্বল।
‘তুমি আকাশ এখন যদি’,
‘আমি হারিয়ে ফেলেছি গানের সাথীরে’,
‘রিমঝিমি রিমঝিমি’,
‘আবিরে রাঙালো কে আমায়’,
‘চোখের মণি হারিয়ে খুঁজি’—
এসব গান শুধু গান হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে বাঙালির এক একটি সময়ের স্মৃতি।
নির্মলা মিশ্র ছিলেন বহুমাত্রিক সংগীতশিল্পী। আধুনিক বাংলা গান কিংবা চলচ্চিত্রের গানেই তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, শ্যামাসংগীত, দেশাত্মবোধক গান ও লোকগীতি। গেয়েছেন গীতিনাট্যেও। ১৯৭৬ সালে উত্তম কুমারের মহালয়া গীতিনাট্যে তাঁর অংশগ্রহণও তাঁর শিল্পীজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
বাংলা সংগীতের বহু কিংবদন্তির সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ মিলেছে। মান্না দে, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শিপ্রা বসুসহ বহু খ্যাতিমান শিল্পীর সঙ্গে তিনি দ্বৈত গান গেয়েছেন।
একজন শিল্পীর কণ্ঠের সৌন্দর্য কেবল তাঁর একক গানে নয়; অন্য কণ্ঠের সঙ্গে মিশেও যখন নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে পারে, তখনই তার প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়। নির্মলা মিশ্রের কণ্ঠে সেই স্বাতন্ত্র্য ছিল।
তাঁর জীবনসঙ্গী প্রদীপ দাশগুপ্তও ছিলেন গায়ক ও গীতিকার। ফলে ব্যক্তিজীবনেও সংগীত ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি পেয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। কিন্তু শিল্পীর প্রকৃত সম্মাননা কি কোনো পদক, কোনো পুরস্কার, কোনো স্মারকফলক?
না।
শিল্পীর প্রকৃত পুরস্কার
মানুষের মনে বেঁচে থাকা।
নির্মলা মিশ্র সেই পুরস্কার পেয়েছেন।
কারণ তাঁর গান আজও পুরোনো দিনের অ্যালবাম খুলে বসা মানুষের পাশে এসে বসে। কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে, কোনো নিঃসঙ্গ রাতে, কোনো হারিয়ে যাওয়া প্রেমের স্মৃতিতে কিংবা কোনো অকারণ মনখারাপের মুহূর্তে তাঁর গান হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে।
মনে হয়—
এই গান তো আমারই কথা বলে!
৩১ জুলাই ২০২২।
সেদিন থেমে গেল নির্মলা মিশ্রের পার্থিব কণ্ঠ। বাংলা গানের আকাশ থেকে যেন একটি পরিচিত নক্ষত্র ঝরে পড়ল। কিন্তু নক্ষত্র কি সত্যিই ঝরে পড়ে? কিছু নক্ষত্র তো মানুষের স্মৃতির আকাশে আরও উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
নির্মলা মিশ্রও তেমনই।
আজ তাঁর কণ্ঠ নেই,
কিন্তু তাঁর গান আছে।
আজ তিনি আমাদের সামনে নেই,
কিন্তু তাঁর সুর আছে।
আজ তাঁকে ছুঁয়ে দেখা যায় না,
কিন্তু তাঁর কণ্ঠ ছুঁয়ে যায় আমাদের হৃদয়।
আর যখন কোনো এক নিঃশব্দ রাতে দূর থেকে ভেসে আসে—
“এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না…”
তখন মনে হয়, জীবন আসলে কত অদ্ভুত!
আমরা সারাজীবন একটি ঝিনুক খুঁজি—
ভেতরে হয়তো মুক্তো থাকবে বলে।
কিন্তু কখনো কখনো সেই ঝিনুকের ভেতরে মুক্তো না থাকলেও, তার গায়ে লেগে থাকে সমুদ্রের গন্ধ, ঢেউয়ের স্মৃতি আর অগণিত না-বলা গল্প।
নির্মলা মিশ্র ছিলেন তেমনই এক ঝিনুক—
যাঁর ভেতর থেকে আমরা শুধু একটি মুক্তো নয়,
পেয়েছি অসংখ্য অমলিন সুর।
তাই শিল্পী চলে গেলেও তাঁর গানকে বিদায় বলা যায় না।
কারণ—
কণ্ঠ থেমে যায়, সুর থামে না।
জীবন শেষ হয়, গান শেষ হয় না।
মানুষ চলে যায়, শিল্প থেকে যায়।
সুরের সেই মায়াবতী শিল্পী নির্মলা মিশ্র—
আপনাকে তাই বিস্মৃতির অন্ধকারে নয়,
বাংলা গানের আলোয়, আমাদের ভালোবাসায়, আমাদের স্মৃতিতে—
চিরদিন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি।


