স্মরণ – বীর মুক্তিযোদ্ধা – শহীদ কাজী নুরুন্নবী

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান

ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

কিছু মৃত্যু শুধু মৃত্যু নয়—
কিছু মৃত্যু একটি জাতির জন্মের ইতিহাস।

কিছু মানুষ চলে যান অসমাপ্ত স্বপ্ন রেখে,
কিন্তু তাঁদের রক্তের বিনিময়ে একটি জাতি পেয়ে যায় তার স্বাধীনতা।

শহীদ কাজী নুরুন্নবী—বাবুল ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
তাঁর জীবন ছিল স্বপ্নে ভরা, সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ; কিন্তু দেশের স্বাধীনতার ডাক যখন এলো, তখন নিজের ভবিষ্যৎকে তুচ্ছ করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন মাতৃভূমির মুক্তির পথ।

উত্তর জনপদের ছোট্ট শহর নওগাঁর কাজীপাড়ার এক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নুরুন্নবী। তাঁদের বাড়ির প্রধান ফটকে লেখা—‘লতা বিতান’। পিতা কাজী সাখাওয়াত হোসেন, মাতা নূরুস সাবাহ রোকেয়া।

তাঁর জন্ম ৩১ জুলাই।

শৈশব থেকেই মেধাবী, সংবেদনশীল ও সৃজনশীল নুরুন্নবীর সামনে ছিল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। তিনি চিকিৎসক হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র এবং একই সঙ্গে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি।

কিন্তু ১৯৭১ শুধু একটি সাল ছিল না।

১৯৭১ ছিল বাঙালির অস্তিত্বের প্রশ্ন।
১৯৭১ ছিল স্বাধীনতার ডাক।
১৯৭১ ছিল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ।

সেই ডাকে সাড়া দিয়ে নুরুন্নবী বই-খাতা সরিয়ে হাতে তুলে নেন মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্ব।

চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রন থেকে রণাঙ্গনের পোশাকে

যে তরুণের হাতে থাকার কথা ছিল স্টেথোস্কোপ, রোগীর নাড়ি পরীক্ষা করার কথা ছিল, মানুষের জীবন বাঁচানোর কথা ছিল—সেই তরুণই একদিন নিজের জীবনকে বাজি রেখে নেমে পড়লেন দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিব বাহিনীর রাজশাহী বিভাগের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর সামনে তখন দুটি পথ ছিল—

একটি নিজের নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ;
অন্যটি ছিল অনিশ্চিত মৃত্যু, রক্ত, নির্যাতন আর যুদ্ধের পথ।

তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিলেন।

কারণ তাঁর কাছে নিজের জীবন থেকে বড় হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

ডায়েরির পাতায় বন্দি এক তরুণের স্বপ্ন

যুদ্ধের দিনগুলোতেও তাঁর ছিল প্রতিদিনের ডায়েরি লেখার অভ্যাস। প্রতিরাতে তিনি লিখতেন দিনের কথা, যুদ্ধের কথা, মানুষের কথা, নিজের অনুভূতির কথা।

একজন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা তরুণ,
একজন ছাত্রনেতা,
একজন মুক্তিযোদ্ধা—
তাঁর মনের ভেতরের সেই মানুষটির কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ডায়েরির পাতায়।

লেখার হাতও ছিল চমৎকার।

হয়তো তিনি বেঁচে থাকলে একজন মেধাবী চিকিৎসক হতেন।
হয়তো হয়ে উঠতেন একজন স্বনামধন্য লেখক।
হয়তো তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসত আরও কত গল্প, কত স্মৃতি, কত জীবনকথা।

কিন্তু ইতিহাস তাঁকে অন্য এক দায়িত্বের জন্য বেছে নিয়েছিল।

১ অক্টোবর ১৯৭১—তারপর আর কোনো খবর নেই

১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হন কাজী নুরুন্নবী।

তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে—যে স্থান পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের অন্যতম ভয়াবহ স্মৃতিবাহী স্থান।

তারপর?

আর কোনোদিন ফিরে আসেননি বাবুল।

পরিবারের কাছে আর কোনো সংবাদ পৌঁছেনি।
ফিরে আসেনি তাঁর পরিচিত কণ্ঠ।
ফিরে আসেনি তাঁর তরুণ মুখ।
ফিরে আসেনি সেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছেলেটি।

একটি পরিবার অপেক্ষা করেছে।
একটি শহর অপেক্ষা করেছে।
একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা নিজ চোখে দেখে যেতে পারেননি তিনি।

বিজয় তিনি দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু বিজয় এনে দিয়েছেন

ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস!

যে তরুণ নিজের জীবন দিয়ে স্বাধীনতার পথ তৈরি করলেন, তিনিই স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখে যেতে পারলেন না।

কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।

আর সেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি পতাকায়, প্রতিটি লাল-সবুজে, প্রতিটি মুক্ত বাতাসে, প্রতিটি স্বাধীন উচ্চারণে মিশে আছে কাজী নুরুন্নবীর মতো অসংখ্য শহীদের রক্ত।

তাঁরা স্বাধীনতা ভোগ করার জন্য যুদ্ধ করেননি।
তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন—পরবর্তী প্রজন্ম যেন স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।

তাঁদের কেউ ফিরে এসেছেন।
কেউ আর ফেরেননি।

কাজী নুরুন্নবী তাঁদেরই একজন।

খ্যাতির চেয়ে দেশের স্বাধীনতা ছিল বড়

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল।
লেখক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
সামনে ছিল দীর্ঘ জীবন।

কিন্তু তিনি জানতেন—

একটি পরাধীন দেশে ব্যক্তিগত সাফল্য কখনো পূর্ণ স্বাধীনতার বিকল্প হতে পারে না।

তাই নিজের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে বিসর্জন দিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।

তিনি হয়তো খ্যাতি পাননি,
পুরস্কার পাননি,
নিজ হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলতে পারেননি।

কিন্তু তিনি পেয়েছেন তার চেয়েও বড় কিছু—

একটি স্বাধীন দেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকার গৌরব।

নওগাঁ ও রাজশাহীর স্মৃতিতে বাবুল

শহীদ কাজী নুরুন্নবীর স্মৃতি আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করে তাঁর প্রিয় মানুষ, তাঁর জন্মভূমি এবং তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

তাঁর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাস তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।

নওগাঁয়ও তাঁর স্মৃতি ধরে রাখার প্রয়াস রয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘পার নওগাঁ শহীদ কাজী নুরুন্নবী মার্কেট’ তাঁর নাম বহন করছে।

কিন্তু কোনো ভবন, কোনো মার্কেট, কোনো স্মৃতিফলকই তাঁর আত্মত্যাগের পূর্ণ মূল্য ধারণ করতে পারে না।

কারণ তাঁর প্রকৃত স্মৃতিস্তম্ভ হলো—

স্বাধীন বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মানচিত্রই তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ।
লাল-সবুজ পতাকাই তাঁর স্মৃতিফলক।
স্বাধীন বাতাসই তাঁর জন্য জাতির শ্রদ্ধার্ঘ্য।

আজ তাঁর জন্মদিনে, তাঁর স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়—

যে তরুণের বয়স ছিল স্বপ্ন দেখার,
সে তরুণ নিজের স্বপ্নকে মাটিতে রেখে
একটি জাতির স্বপ্নকে সত্যি করে গেছেন।

তিনি বিজয়ের পতাকা দেখে যেতে পারেননি।

কিন্তু বিজয়ের পতাকায় তাঁর রক্তের রং মিশে আছে।

তাই তাঁর মৃত্যু নেই।

রবীন্দ্রনাথের সেই অমর পঙ্‌ক্তিই যেন তাঁকে স্মরণ করে আজও উচ্চারিত হয়—

“নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”

শহীদ কাজী নুরুন্নবী—
বাবুল—
আপনি নেই, কিন্তু আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশ আছে।

আপনার অসমাপ্ত জীবনই আমাদের স্বাধীনতার পূর্ণতার একটি অংশ।

শ্রদ্ধা ও অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় স্মরণ করি
বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্র,
মুজিব বাহিনীর সাহসী যোদ্ধা
শহীদ কাজী নুরুন্নবীকে।

আপনার রক্ত বৃথা যায়নি।
আপনার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।