মাতৃভাষার মর্যাদা ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যাঁরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাঙালি জাতিকে চিরঋণী করে গেছেন, তাঁদের অন্যতম ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ। তিনি শুধু মানিকগঞ্জের গর্ব নন, সমগ্র বাঙালি জাতির অহংকার ও আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক।
১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল বলধারা গ্রামে তাঁর জন্ম। বর্তমানে গ্রামটি রফিকনগর নামেও পরিচিত। তাঁর পিতার নাম আবদুল লতিফ এবং মাতার নাম রাফিজা খাতুন। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রফিক ছিলেন সবার বড়।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সাহসী ও সংস্কৃতিমনা। ১৯৪৯ সালে স্থানীয় বায়রা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে পিতার ব্যবসায়িক কাজে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।
৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি :
১৯৪৮ সাল থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদ ও আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে ছাত্রসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় রক্তাক্ত দিন।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্রসমাজ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে শুরু হওয়া ছাত্রদের মিছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সেই ঘাতক বুলেটে গুলিবিদ্ধ হন রফিক উদ্দিন আহমেদ। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
ভাষার দাবিতে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের মধ্যে রফিক ছিলেন প্রথম সারির আত্মত্যাগী বীরদের একজন। অনেক বিবরণে তাঁকে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম গুলিবিদ্ধ শহীদ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সেদিনের সেই রক্তাক্ত রাজপথে রফিকের আত্মদান বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরও বেগবান করে। একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগের পথ ধরেই পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
শহীদ রফিকের মরদেহ ঢাকার আজিমপুর পুরোনো কবরস্থানে দাফন করা হয়। মাতৃভাষার জন্য জীবন দেওয়া এই বীর সন্তানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানিয়ে ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
তাঁর স্মৃতি ও আত্মত্যাগকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের জন্মস্থান রফিকনগরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর।
আজ ৩০ অক্টোবর। এই দিনে জন্মেছিলেন সেই সাহসী সন্তান, যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামকে মহিমান্বিত করেছেন।
রফিকরা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নন, তাঁরা সমগ্র বাঙালি জাতির। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা বাংলা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের অহংকার, আমাদের আত্মপরিচয়।
যত দিন বাংলা ভাষা থাকবে, যত দিন পৃথিবীর বুকে বাঙালি জাতি বেঁচে থাকবে, তত দিন রফিক উদ্দিন আহমেদের নাম উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।
ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ—আপনার আত্মত্যাগ বাঙালি জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


