ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ,
ঐখানেতে বাস করে কানা বগির ছা—
বাংলার প্রকৃতি, গ্রামীণ জনপদ আর শৈশবের সহজ-সরল সৌন্দর্য যাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তিনি কবি ও শিশুসাহিত্যিক খান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন। তাঁর লেখা ‘কানা বগির ছা’ কবিতাটি বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অমর সৃষ্টি। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশুর মুখে মুখে উচ্চারিত এই কবিতা আজও আমাদের শৈশবের এক মধুর স্মৃতির নাম।
‘ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ’—কবিতার এই পঙ্ক্তি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলার চিরচেনা গ্রাম। তালগাছ, সবুজ মাঠ, পুকুরপাড়, নদী-নালা আর প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা এক দুরন্ত শৈশব। অতি সাধারণ শব্দের অসাধারণ প্রয়োগে তিনি শিশুদের কল্পনার জগৎকে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় ছিল ছন্দের মাধুর্য, ভাষার সরলতা এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ।
১৯০১ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার চারিগ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি তাঁর আগ্রহ গড়ে ওঠে। কর্মজীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কলকাতা করপোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং শিশুদের মনোজগৎ সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি তাঁর সাহিত্যচর্চাকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছিল।
খান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন শুধু শিশুকবিতার কবি ছিলেন না; জীবনীসাহিত্যেও রেখেছেন স্মরণীয় অবদান। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর রচিত ‘যুগশ্রেষ্ঠ নজরুল’ গ্রন্থটি বিশেষভাবে সমাদৃত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্যকর্ম ও বিপ্লবী চেতনাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বইটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলা শিশুসাহিত্য ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘যুগশ্রেষ্ঠ নজরুল’ গ্রন্থের জন্য একই বছর ইউনেসকো পুরস্কারেও ভূষিত হন। স্বাধীন বাংলাদেশে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৮ সালে তাঁকে প্রদান করা হয় একুশে পদক।
১৯৮১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এই গুণী সাহিত্যিক মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর সৃষ্টি আজও বেঁচে আছে অগণিত শিশুর কণ্ঠে, পাঠকের স্মৃতিতে এবং বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে।
একটি কবিতা কখনো কখনো একটি জাতির শৈশবকে ধারণ করে। ‘কানা বগির ছা’ তেমনই একটি কবিতা। যে কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি পড়লেই আমাদের ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই ফেলে আসা গ্রামে, শৈশবের উঠোনে, দুরন্ত দিনগুলোর কাছে।
কালের পরিক্রমায় মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু হয় না। খান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীনও তেমনই একজন স্রষ্টা, যিনি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলার প্রকৃতি ও শৈশবকে অমর করে রেখেছেন।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি বাংলা শিশুসাহিত্যের এই কৃতী কবিকে।


