কিছু কণ্ঠ কখনো হারিয়ে যায় না।
কিছু শব্দ সময়ের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে যান—তাঁদের কর্মে, তাঁদের কলমে, তাঁদের উচ্চারণে।
তোয়াব খান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
একজন সাংবাদিক, একজন সম্পাদক, একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক—আর সর্বোপরি, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক জীবন্ত ইতিহাস।
সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী রসুলপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৩৪ সালের ২৪ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন তোয়াব খান। পিতা আবদুল হাকিম খান, মাতা আজরা খানম। পারিবারিকভাবেই তাঁর চারপাশে ছিল জ্ঞান, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার আবহ। কিংবদন্তি সাংবাদিক মাওলানা আকরম খাঁ ছিলেন তাঁর মামা, আর প্রখ্যাত সাংবাদিক আবেদ খান ছিলেন তাঁর ভাই।
তবে উত্তরাধিকার তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল, নিজের মেধা, মনন, সাহস ও কর্মই তাঁকে তৈরি করেছিল তোয়াব খান হিসেবে।
কলম হাতে যে পথচলা—
১৯৫৩ সালে সাপ্তাহিক ‘জনতা’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় তাঁর হাতেখড়ি। ১৯৫৫ সালে যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মেধা ও পেশাদারিত্ব তাঁকে নিয়ে যায় দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। ১৯৬১ সালে তিনি দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক হন।
এরপর ১৯৬৪ সালে যোগ দেন তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান-এ এবং ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই পত্রিকাই নতুন পরিচয়ে হয়ে ওঠে দৈনিক বাংলা। ১৯৭২ সালে তোয়াব খান এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কখনো শুধুই জীবিকা ছিল না।
সংবাদ ছিল তাঁর কাছে মানুষের কথা বলার মাধ্যম, আর কলম ছিল সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি।
একাত্তরে কলম হয়ে উঠেছিল অস্ত্র
তোয়াব খানের জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়—মহান মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭১ সালে তিনি যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করেও শব্দ, কণ্ঠ ও কলমকে অস্ত্র বানিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধে লড়েছিলেন, তোয়াব খান ছিলেন তাঁদেরই একজন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তখন ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র। দেশের মানুষকে সাহস জোগানো, মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করা এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মিথ্যাচারের জবাব দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই বেতারের ভূমিকা ছিল অনন্য।
সেই বেতারে তোয়াব খানের কণ্ঠে প্রচারিত ‘পিণ্ডির প্রলাপ’ অনুষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণতা ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি পাকিস্তানি শাসকদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।
সেদিন বাংলাদেশের আকাশে যখন যুদ্ধের দামামা,
মাটিতে যখন রক্তের বন্যা,
তখন শব্দের সৈনিকেরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছিলেন—
বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবেই।
তোয়াব খান ছিলেন সেই উচ্চারণের একজন সাহসী কণ্ঠ।
বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব
স্বাধীনতার পর তোয়াব খানের কর্মজীবন নতুন মাত্রা পায়।
১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিকটবর্তী একজন পেশাদার সাংবাদিক ও তথ্যকর্মী। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র পরিচালনা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং সদ্য স্বাধীন দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।
পরবর্তীকালে তিনি সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা এবং প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু সংবাদপত্রের একজন দক্ষ সম্পাদক ছিলেন না—রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন তাঁর কর্মের স্বাক্ষর।
সম্পাদকের আসনে, সাংবাদিকতার অভিভাবক হিসেবে
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের এক পর্যায়ে তিনি যুক্ত হন দৈনিক জনকণ্ঠের সঙ্গে। পত্রিকাটির উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে আবারও দৈনিক বাংলার সম্পাদনার দায়িত্বে আসেন।
তাঁর চারপাশে গড়ে উঠেছিল সাংবাদিকদের একাধিক প্রজন্ম। অনেক তরুণ সাংবাদিক তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন সংবাদকে শুধু সংবাদ হিসেবে না দেখে সময়, সমাজ ও মানুষের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে।
তিনি ছিলেন এমন এক সাংবাদিক, যাঁদের কাছে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম ছিল সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
স্বীকৃতি এসেছে দেরিতে, কিন্তু যথার্থ মর্যাদায়
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তাঁর দীর্ঘ ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে।
একই বছর তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হন।
কিন্তু সত্যিকার অর্থে তোয়াব খানের সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনো পদক নয়।
তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন—
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে নিজের নামটি স্থায়ী করে যাওয়া।
তাঁর সবচেয়ে বড় সম্মান—
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শব্দকে অস্ত্র করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
আর তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—
তিনি ছিলেন সময়ের সাক্ষী এবং ইতিহাসের একজন নির্মোহ ভাষ্যকার।
একটি জীবন, একটি সময়ের দলিল
তোয়াব খানের জীবনকে যদি পেছন ফিরে দেখি, তাহলে তাঁর জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু বাঁক যেন পাশাপাশি হেঁটে যায়।
পঞ্চাশের দশকের সাংবাদিকতা,
ষাটের দশকের রাজনৈতিক উত্তাপ,
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ,
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়,
বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র পরিচালনার সময়,
স্বাধীন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বিকাশ—
সবকিছুরই কোনো না কোনো অধ্যায়ে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে।
তাই তোয়াব খান শুধু একজন সাংবাদিকের নাম নন।
তিনি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের একটি যুগের নাম।
তিনি মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিকদের একটি উজ্জ্বল নাম।
তিনি আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়।
শেষ হয়ে যায়নি তাঁর গল্প
২০২২ সালের ১ অক্টোবর ৮৭ বছর বয়সে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তোয়াব খান।
একজন সাংবাদিকের কলম থেমে গেল।
একজন শব্দসৈনিকের কণ্ঠ নীরব হলো।
একজন সম্পাদকের কর্মব্যস্ত দিন শেষ হলো।
কিন্তু তাঁর গল্প শেষ হলো না।
কারণ মানুষ চলে যায়,
কর্ম থেকে যায়।
কণ্ঠ থেমে যায়,
উচ্চারণ থেকে যায়।
কলম থেমে যায়,
লেখা থেকে যায়।
আর সত্যিকার অর্থে যারা ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন, তাঁরা মৃত্যুর পরও মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন।
তোয়াব খানও তেমনি বেঁচে থাকবেন—
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে,
স্বাধীন বাংলা বেতারের স্মৃতিতে,
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতায়,
সাংবাদিকদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের স্মৃতিতে।
সাতক্ষীরার রসুলপুরের যে মাটি থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই মানুষটির কণ্ঠ একদিন পৌঁছে গিয়েছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উত্তাল বাংলার কোটি মানুষের ঘরে।
আজ সেই কণ্ঠ নেই।
কিন্তু তাঁর উচ্চারিত শব্দগুলো এখনো আমাদের কানে বাজে।
কিছু মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করেন তাঁদের কর্ম দিয়ে।
তোয়াব খান ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি
মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক, বর্ষীয়ান সাংবাদিক, সম্পাদক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত তোয়াব খানকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।


