হলমার্কের ৩০০ কোটিসহ সোনালী ব্যাংকের বিশাল মুনাফা অর্জন

দেশের ব্যাংকিং খাতের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক পিএলসি তাদের ব্যবসায়িক সাফল্যে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। গত এক বছরে ব্যাংকটি ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায়ের পাশাপাশি বিশাল অংকের পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। বিশেষ করে, বহুল আলোচিত ‘হলমার্ক গ্রুপ’ থেকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ৩০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায় ব্যাংকের সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আর্থিক সাফল্য ও মুনাফার চিত্র

মঙ্গলবার ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান বিদায়ী বছরের অভাবনীয় সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮ হাজার ১৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের ৫ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার তুলনায় অনেক বেশি। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণের পর চূড়ান্ত হিসাবে বছর শেষে প্রকৃত মুনাফা ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্যাংকটির আর্থিক সূচকের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

সূচকের নাম পরিমাণ/হার (২০২৪) লক্ষ্যমাত্রা ও মন্তব্য
পরিচালন মুনাফা ৮,০১৭.৩৫ কোটি টাকা উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত।
প্রকৃত মুনাফা (সম্ভাব্য) ১,৫০০ কোটি টাকা + চূড়ান্ত হিসাব প্রক্রিয়াধীন।
খেলাপি ঋণ আদায় (নগদ) ১,২০৩ কোটি টাকা হলমার্ক থেকে ৩০০ কোটিসহ।
খেলাপি ঋণের হার ১৫.৪% ২০২৬-২৭ এর মধ্যে ১০%-এর নিচে আনার লক্ষ্য।
মূলধন ঘাটতি নেই (শূন্য) দীর্ঘদিনের অপবাদ থেকে মুক্তি।

হলমার্ক ইস্যু ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা

সোনালী ব্যাংকের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় ‘হলমার্ক কেলেঙ্কারি’র পর এই প্রথম বড় অংকের অর্থ পুনরুদ্ধারে সফল হয়েছে কর্তৃপক্ষ। শওকত আলী খান জানান, হলমার্ক গ্রুপ থেকে ৩০০ কোটি টাকা নগদে আদায় করা হয়েছে। এছাড়া অবশিষ্ট পাওনা আদায়ের লক্ষে উক্ত প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি ও স্থাবর সম্পদ নিলামের মাধ্যমে বিক্রির আইনি প্রক্রিয়া সচল রয়েছে।

শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে ইতিমধ্যে ৭৪৫ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ১৫.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছর এটি ১১-১২ শতাংশে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে এক অংকের ঘরে (১০ শতাংশের নিচে) নামিয়ে আনা হবে।

মূলধন ঘাটতি থেকে মুক্তি ও সরকারি পাওনা

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা ছিল মূলধন ঘাটতি। তবে সোনালী ব্যাংক চলতি বছর থেকে সেই সংকট কাটিয়ে উঠেছে। এমডি গর্বের সাথে ঘোষণা করেন, সোনালী ব্যাংক এখন মূলধন ঘাটতিমুক্ত একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পে এককভাবে ঋণপত্র (LC) পরিচালনার বিপরীতে ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মাশুল এখনো বকেয়া রয়েছে। এই বিশাল অর্থ আদায় হলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও সুসংহত হবে।

ঝুঁকি হ্রাস ও আমানতকারীদের আস্থা

ঋণ যেন নির্দিষ্ট কিছু শাখায় কেন্দ্রীভূত না হয়, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে করা সমঝোতা চুক্তি (MoU) অনুযায়ী পাঁচটি শাখায় অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে ৩৭ শতাংশ ঋণ কেন্দ্রীভূত অবস্থায় আছে, যা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শওকত আলী খান দৃঢ়তার সাথে বলেন, “হলমার্কের ঘটনার পর সোনালী ব্যাংকে আর বড় কোনো অনিয়ম ঘটেনি। আমানতের প্রবাহ বৃদ্ধিতে প্রমাণ হয় যে, সাধারণ মানুষের আস্থা সোনালী ব্যাংকের প্রতি এখনো অটুট।” ঋণগ্রহীতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ এবং নীতি সহায়তার মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করার মাধ্যমে ঋণ পুনরুদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকটি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।