১৫ বছর পূর্ণের আগে পেনশনারের মৃত্যু, বিধবা-বিপত্নীকের কী হবে

শতভাগ পেনশন সমর্পণ করে অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৫ বছর পর মাসিক পেনশন পুনঃস্থাপনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট পেনশনার মারা গেলে তাঁর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী পুনঃস্থাপিত পেনশনের সুবিধা পাবেন কি না—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। ফলে একদিকে সরকারি বিধানের ব্যাখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা, অন্যদিকে আর্থিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েছেন এমন অনেক প্রবীণ নারী ও পরিবারের সদস্য।

এরই একটি উদাহরণ পিয়ারা বেগমের জীবন। তাঁর স্বামী মো. শাহজাহান শাহ ২০১০ সালে জনতা ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নেন। অবসরের পর পারিবারিক প্রয়োজনে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় তিনি সে সময় প্রচলিত বিধান অনুযায়ী নিজের পেনশনের শতভাগ সমর্পণ করে এককালীন অর্থ তুলে নেন। পরবর্তী সময়ে সেই অর্থও ব্যয় হয়ে যায়।

এরপর স্ত্রীকে নিয়ে দুই ছেলের আয়ের ওপর নির্ভর করে চলছিল শাহজাহান শাহর পরিবার। ছেলেদের নিজেদের সংসার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের ব্যয় বহনের চাপও বাড়তে থাকে। ২০২০ সালের দিকে শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর সত্তরোর্ধ্ব পিয়ারা বেগমকে সন্তানদের ওপর নির্ভর করেই জীবন কাটাতে হচ্ছে।

পিয়ারা বেগমের প্রশ্ন, ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পেনশন পুনঃস্থাপনের সুযোগ যদি থাকে, তাহলে সেই সময়ের আগেই পেনশনার মারা গেলে তাঁর স্ত্রী কেন সেই সুবিধা পাবেন না। তাঁর মতে, জীবিত অবস্থায় স্বামীর পেনশন পুনঃস্থাপিত হলে যে সুবিধা পরবর্তী সময়ে স্ত্রী পেতেন, পেনশনারের অকালমৃত্যুর কারণে সেই সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া বিধবা নারীদের জন্য বড় আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

কীভাবে শতভাগ পেনশন সমর্পণের ব্যবস্থা বদলাল

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শতভাগ পেনশন সমর্পণ বা এককালীন অর্থ তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা ১৯৯৪ সালে চালু হয়। পরে ২০১৭ সালের ৩০ জুন এ পদ্ধতি বন্ধ করা হয়। একই বছরের ১ জুলাই থেকে পেনশনের ৫০ শতাংশ সরকারের কাছে সংরক্ষিত রাখার বিধান চালু হয়।

১৯৯৪ থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২৩ বছরে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৫২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী শতভাগ পেনশন সমর্পণ করে অবসরে যান। তৎকালীন বিধান অনুযায়ী তাঁরা দুটি উৎসব বোনাস, বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং মাসিক চিকিৎসা ভাতার মতো সুবিধা পেতেন।

পরবর্তী সময়ে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের জন্য ১৫ বছর পর মাসিক পেনশন পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগ ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর অবসর-পরবর্তী ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলে মাসিক পেনশন পুনঃস্থাপন করা হবে। এ ১৫ বছর গণনা করা হবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর এলপিআর বা অবসর-উত্তর ছুটি (পিআরএল) শেষ হওয়ার পরের দিন থেকে। সুবিধাটি ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়। তবে ওই তারিখের আগের কোনো বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়নি।

পুনঃস্থাপিত পেনশনের ওপর প্রতি বছর ১ জুলাই ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বিধানও রাখা হয়। শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী পেনশনারদের বিভিন্ন আবেদন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

২০১৮ সালের প্রজ্ঞাপন জারির সময় প্রায় ২০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর ১৫ বছর ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়েছিল বলে জানা যায়। তাঁদের পেনশন পুনঃস্থাপনে সরকারের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা।

২০১৯ সালের প্রজ্ঞাপনে পরিবার পেল পেনশনের সুযোগ

২০১৮ সালের প্রজ্ঞাপনে পেনশন পুনঃস্থাপনের পর পেনশনার মারা গেলে তাঁর পরিবারের কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়নি। পরে ২০১৯ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বিষয়টি স্পষ্ট করে।

সেখানে বলা হয়, ২০১৮ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কোনো শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর পেনশন পুনঃস্থাপিত হয়ে থাকলে তাঁর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী এবং প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে তারা নির্ধারিত শর্তে পুনঃস্থাপিত পেনশনের সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতাও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী পাওয়ার কথা বলা হয়।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে মূল জটিলতা। কারণ, পেনশন পুনঃস্থাপনের ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পেনশনার মারা গেলে তাঁর পরিবার কী সুবিধা পাবে—২০১৮ বা ২০১৯ সালের প্রজ্ঞাপনের কোনোটিতেই তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

সরকারের ব্যাখ্যা কী

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা হলো, পারিবারিক পেনশন পাওয়ার জন্য প্রথমে মূল পেনশনারের পেনশন পুনঃস্থাপিত হতে হবে। ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পেনশনার মারা গেলে তাঁর নামে পেনশন পুনঃস্থাপনের সুযোগই তৈরি হয় না। ফলে সেই পুনঃস্থাপিত পেনশন তাঁর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর কাছে পারিবারিক পেনশন হিসেবে হস্তান্তরের সুযোগও বর্তমান বিধানে নেই।

মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে যুক্তি দিয়েছেন, প্রজ্ঞাপনে ‘পুনঃস্থাপিত হয়ে থাকলে’ সেই পেনশনের সুবিধা বিধবা স্ত্রী, বিপত্নীক স্বামী বা প্রতিবন্ধী সন্তানের পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ পেনশন পুনঃস্থাপিত হওয়াটিই পরিবারের সুবিধা পাওয়ার পূর্বশর্ত। পেনশনারের জীবদ্দশায় সেটি পুনঃস্থাপিত না হলে পরবর্তী সময়ে পরিবারের সদস্যদের তা পাওয়ার সুযোগ নেই—এটাই সরকারের বর্তমান ব্যাখ্যা।

তবে চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ চিকিৎসা ভাতা শতভাগ পেনশনের মতো সমর্পণ করা হয় না। ফলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী চিকিৎসা ভাতা পাওয়ার সুযোগ থাকে।

আবেদন করেও সুবিধা পাননি অনেকে

অর্থ বিভাগে গত কয়েক বছরে এ ধরনের বেশ কিছু আবেদন জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য প্রায় একই—শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী কোনো পেনশনার ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে তাঁর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীকে অন্তত আজীবন পেনশন সুবিধার আওতায় আনা হোক।

তবে এ ধরনের আবেদনকারীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সংরক্ষিত নেই। ফলে দেশে ঠিক কতজন বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী এই সমস্যার মধ্যে রয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাবও পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত এ সুবিধা চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি। এর পেছনে মূল যুক্তি হলো—শতভাগ পেনশন সমর্পণ করার পর ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পেনশনার মারা গেলে পুনঃস্থাপনের শর্ত পূরণ হয় না।

মানবিক বিবেচনার দাবি

অন্যদিকে, বিষয়টি কেবল বিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে দেখলে সমস্যার মানবিক দিকটি উপেক্ষিত থেকে যায় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। শতভাগ পেনশন সমর্পণের সময় একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী যে এককালীন অর্থ পান, তা অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় হিসেবে ধরে রাখা সম্ভব হয় না। পারিবারিক চিকিৎসা, ঋণ পরিশোধ, সন্তানদের প্রয়োজন কিংবা আকস্মিক আর্থিক সংকটে সেই অর্থ দ্রুত ব্যয় হয়ে যেতে পারে।

পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার যখন নিয়মিত মাসিক আয়ের উৎস হারায়, তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রবীণ বিধবা স্ত্রী যদি নিজে আয় করতে সক্ষম না হন, তাহলে সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া অনেক সময় তাঁর সামনে অন্য কোনো পথ থাকে না।

এ কারণে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন, ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পেনশনারের মৃত্যু হলে বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর জন্য বিশেষ কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা সরকার বিবেচনা করতে পারে। তাঁদের যুক্তি, এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে হলে সম্ভাব্য উপকারভোগীর সংখ্যা এবং সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক দায় আগে নিরূপণ করা প্রয়োজন। এরপর বিধি সংশোধন বা পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা যেতে পারে।

বর্তমানে মূল প্রশ্নটি তাই শুধু পেনশন পুনঃস্থাপনের নয়; বরং শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা গেলে তাঁর পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বের সীমা কোথায়—সেটিও সামনে এসেছে। স্পষ্ট বিধান না থাকায় একদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যার ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে, অন্যদিকে পিয়ারা বেগমের মতো পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।