২২ ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে, ঝুঁকি বাড়ছে পুরো খাতে

দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি বর্তমানে পুঞ্জীভূত লোকসানে রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের সম্মিলিত পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে পুরো ব্যাংক খাত পরিচালন পর্যায়ে ৭৮৯ কোটি টাকা মুনাফা করলেও প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন ব্যয় ও সমন্বয়ের পর নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া এক প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংক খাতের এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফার ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ, দুর্বল সম্পদমান এবং মূলধনের ঘাটতি। এসব কারণে কাগজে-কলমে পরিচালন মুনাফা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অনেক ব্যাংককে নিট লোকসান গুনতে হচ্ছে।

লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক—জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকও লোকসানে রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান রয়েছে এই তালিকায়।

বেসরকারি খাতের ১৫টি ব্যাংকও পুঞ্জীভূত লোকসানের মুখে রয়েছে। এগুলো হলো এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, মেঘনা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংক খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বর্তমান লোকসান সেই দীর্ঘদিনের সমস্যারই প্রতিফলন। তবে পরিস্থিতি উন্নয়নে ব্যাংকটি কাজ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, লোকসানে থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১২টির ৯টি আওয়ামী লীগ সরকারের নেতা ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন অনিয়মের পাশাপাশি ঋণের নামে অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিনের এসব অনিয়ম ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে এবং এর প্রভাব পড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণেও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা এখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, একসঙ্গে ২২টি ব্যাংকের লোকসানে থাকা ব্যাংক খাতের জন্য স্বাভাবিক বা স্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি নয়। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণের হার এবং লোকসানে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা—দুটিই আর্থিক খাতের দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এর ফলে মানুষের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে।

শুধু লোকসান নয়, ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতিও উদ্বেগ তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চ পর্যন্ত ১৫টি ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পারেনি। অন্যদিকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নিয়েছে।

এই সহায়তার মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৭ হাজার কোটি, এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংক পেয়েছে ৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংক ৪ হাজার ৯০০ কোটি, এবি ব্যাংক ৪ হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ৪ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৬১৫ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ২৫২ কোটি এবং পদ্মা ব্যাংক ২৫২ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা পেয়েছে। তবে কোন সময়ের মধ্যে এসব অর্থ দেওয়া হয়েছে, প্রতিবেদনে তা নির্দিষ্ট করা হয়নি।

ব্যাংক খাতের এই সংকট মোকাবিলায় সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। খেলাপি ঋণ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব দেন কমিটির সদস্য ও এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম তাঁর দলের পক্ষ থেকে ব্যাংক খাত সংস্কারে লিখিত প্রস্তাব দেন।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহি করা সরকারের দায়িত্ব এবং কোনো বিষয় গোপন করা হবে না। ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রেও অর্থনীতিতে রাজনীতিকরণের সুযোগ থাকা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য সাইফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সংখ্যার এতগুলো ব্যাংক দেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার।

সব মিলিয়ে, ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লোকসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরতা এবং দুর্বল সম্পদমান—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে আর্থিক খাতের ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অনিয়মের দায় নির্ধারণ এখন ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।