দীর্ঘ ২৭ বছরের নিখোঁজ জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশে ফিরেছেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার আমির হোসেন তালুকদার (৬২)। জীবিকার আশায় ১৯৯৬ সালে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর পর প্রথম কয়েক বছর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও এক পর্যায়ে হঠাৎ করেই সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবার একসময় তাকে মৃত বলেই ধরে নিয়েছিল।
গত বুধবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাতিক এয়ারের (ওডি-১৬২) একটি ফ্লাইটে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছান তিনি। বিমানবন্দরে তাকে গ্রহণ করেন সিভিল এভিয়েশন নিরাপত্তা সদস্য, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক, ব্র্যাক মাইগ্রেশন কর্মসূচির প্রতিনিধি এবং পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর বাবাকে ফিরে পেয়ে ছেলে বাবু তালুকদারসহ পরিবারের সবাই আবেগে ভেঙে পড়েন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রবাস জীবনের শুরুতে আমির হোসেন নিয়মিতভাবে চিঠি ও ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন এবং কিছু অর্থও পাঠাতেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালের পর থেকে হঠাৎ করেই তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ ২৭ বছর অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্যে।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পেনাং অঞ্চলে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি একটি জঙ্গলের পাশে টিনের ঘরে বসবাসকারী এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে দেখতে পান। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন। অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনিই নিখোঁজ আমির হোসেন তালুকদার।
এরপর প্রবাসী সাংবাদিক ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের সহযোগিতায় বিষয়টি ব্র্যাক মাইগ্রেশন কর্মসূচির নজরে আসে। তারা মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ট্রাভেল পাসের ব্যবস্থা করে তাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়।
নিখোঁজ ও প্রত্যাবর্তনের সময়রেখা
| সময়কাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯৯৬ | জীবিকার উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়ায় যাত্রা |
| ১৯৯৬–১৯৯৯ | পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ |
| ১৯৯৯ | হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন |
| ১৯৯৯–২০২৫ | দীর্ঘ ২৭ বছর নিখোঁজ অবস্থায় থাকা |
| ২০২৫ | মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে শনাক্ত |
| ২০২৬ | দেশে প্রত্যাবর্তন |
ব্র্যাক মাইগ্রেশন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে একজন মানুষের নিখোঁজ থাকা এবং পরে ফিরে আসা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগেই তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা মানবিক সংহতির একটি উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসে থাকা অনেক বাংলাদেশি নানা ধরনের সংকটে পড়লেও তাদের সঠিক তথ্য ও অবস্থান সম্পর্কে কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা নেই। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি, যাতে এমন ঘটনা দ্রুত শনাক্ত ও সমাধান করা যায়।
দেশে ফিরে আসার পর আমির হোসেনকে প্রাথমিকভাবে শারীরিক ও মানসিক অবস্থার চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গতা ও মানবেতর অবস্থায় থাকার কারণে তার বিশেষ যত্ন প্রয়োজন বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন।
আমির হোসেনের এই ফিরে আসা শুধু একটি পরিবারের পুনর্মিলন নয়, বরং এটি প্রবাস জীবনের অনিশ্চয়তা, বিচ্ছিন্নতা এবং মানবিক সংকটের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। নড়িয়ার সেই বাড়িতে এখন আনন্দের পাশাপাশি দীর্ঘ ২৭ বছরের শূন্যতার নীরব বেদনা এখনও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।



