বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। একই সাথে দেশের শিল্প খাতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট—এই আট মাসে দেশের প্রধান তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংলাপে অর্থনীতির এই সামগ্রিক চিত্র ও প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। সংলাপে মূল প্রবন্ধ ও মূল্যায়ন উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে সিপিডির অপর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে। অর্থনীতির প্রধান ৩১টি সূচক পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি খাতে ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন ও মাথাপিছু ঋণসহ ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে তীব্র অবনতি ঘটেছে।
শিল্প খাতের ভয়াবহ চিত্রের বিষয়ে আলোকপাত করে সিপিডি জানায়, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিকের মতো কারখানাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার দৈনিক ১,১৮৬ এমএমসিএফডি থেকে কমে ১,১৪৮ এমএমসিএফডিতে নেমেছে। একই সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫.৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক ০.১ শতাংশে নেমেছে।
সংলাপে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখনও কিছুটা অস্বস্তি রয়ে গেছে। সরকার একটি অত্যন্ত নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিলেও, তারা দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার সামগ্রিক চিত্র নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক শ্বেতপত্র বা সমন্বিত দলিল প্রকাশ করেনি। ফলে সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সাথে সরকারি পরিসংখ্যানের মেলবন্ধন ঘটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সাথে রাজনৈতিক পরিচয়ে উচ্চপদে নিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিডি।
তবে মূল্যায়নে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩% থেকে ৭.২%-এ নামা, ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, কৃষিঋণ মওকুফ এবং প্রবীণদের জন্য গণপরিবহনে ছাড় দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলোকে সিপিডি প্রশংসনীয় বলে মনে করে।



