খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২১ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের আদালত ভবনের নিচতলায় অবস্থিত মালখানাটি এখন সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের প্রতীক। গত বছরের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর সারা দেশে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সুযোগে দুর্বৃত্তরা সদর কোর্ট আদালতের মালখানায় ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালায়। সেখান থেকে ৭০টি আগ্নেয়াস্ত্র, শত শত গুলি, বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ৬০ কোটি টাকার সামগ্রী লুট করা হয়। ঘটনার এক বছর পার হলেও লুট হওয়া এসব অস্ত্র ও গুলি এখনও উদ্ধার করতে পারেনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এর ফলে স্থানীয় মানুষজন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন মালখানা থেকে ৫০টি পিস্তল, ২৫০ রাউন্ড গুলি, ১০০টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০টি শুটারগান ও ২৫ রাউন্ড গুলি খোয়া যায়। এছাড়াও, বিভিন্ন মামলার জব্দ করা মাদকদ্রব্য, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, নগদ টাকা ও বিদেশি মুদ্রাসহ প্রায় ৬০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের আলামত চুরি হয়।
এই ঘটনায় মালখানার দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক মনিরুল করিম খান বাদী হয়ে একটি মামলা করেছিলেন। তবে মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। আদালতের পক্ষ থেকে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্তও সম্পন্ন হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ জানান, এই মামলায় এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, লুটপাটের পর কিছু মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য সামগ্রী পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও কোনো অস্ত্র বা গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি যেকোনো সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ভয় আরও বেড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শহরের ব্যবসায়ী বলেন, ‘যদি এই অস্ত্রগুলো রাজনৈতিক হানাহানিতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে আমরা আবারও অস্থিরতার মধ্যে পড়ব।’
আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি মামলার বিচারে সাক্ষ্যের পাশাপাশি আলামতের গুরুত্ব অপরিসীম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মহম্মদ ইসাহাক বলেন, ‘আলামত আদালতে উপস্থাপন করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এতে আসামির খালাস পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।’
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আবদুল ওদুদ ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘একটি মামলার চার্জশিট, সাক্ষ্য-প্রমাণসহ অনেক কিছুই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আদালত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত, তাই আমরা প্রমাণ করতে পারব যে সেখানে আলামতগুলো ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি আলামতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। আমি মনে করি, এই ঘটনার কারণে কোনো আসামি শাস্তি থেকে বাঁচতে পারবে না এবং বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা আসবে না।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মতিউর রহমান জানান, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত ও মালামাল উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে। পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে পুলিশের কোনো গাফিলতি নেই। এ পর্যন্ত অনেককেই সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন জুয়েল বলেন, ‘এখনও কোনো অস্ত্র বা গোলাবারুদ উদ্ধার করতে না পারাটা হতাশাজনক এবং পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা। এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলো নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার হতে পারে, যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ তথা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে।’
স্থানীয়রা মনে করছেন, অপরাধ দমন করার জন্য যেকোনো মূল্যে এই অস্ত্রগুলো উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।
খবরওয়ালা/টিএসএন