অবহেলায় ভীষণ হুমকিতে বাংলাদেশের বীরশ্রেষ্ঠ স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার

 

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ বীরত্ব পুরস্কারপ্রাপ্ত বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও চিরস্মরণীয় করার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্মৃতি জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হয়েছিল যেন নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারে এবং দেশপ্রেম ও ত্যাগের মূল্য উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অনেক গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর অবহেলা, কর্মী সংকট এবং অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে চরম সমস্যায় ভুগছে।

উদাহরণস্বরূপ, নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন লাইব্রেরি ও মেমোরিয়াল মিউজিয়াম দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। এখানে পর্যটক আকর্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই, এবং প্রতিষ্ঠানটি একমাত্র একজন কেয়ারটেকারের নিয়ন্ত্রণে চলছে। দেয়ালের রঙ ফিকে হয়ে গেছে, নয়টি বৈদ্যুতিক পাখার মধ্যে পাঁচটি খারাপ, জানালা ভাঙা, এবং দরজা ও চেয়ারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত। লাইব্রেরিয়ান না থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত বইগুলোও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে।

এভাবে, ফরিদপুরের বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ লাইব্রেরি ও মেমোরিয়াল মিউজিয়ামও সংকটের মধ্যে রয়েছে। এখানে ৫,১৭৯টি বই রয়েছে, কিন্তু হিরো সংক্রান্ত মাত্র তিনটি সামগ্রী সংরক্ষিত। যোগাযোগ ও প্রবেশাধিকার দুর্বল হওয়ায় ভ্রমণকারী খুব কম আসে। স্থায়ী কর্মী না থাকার কারণে মিউজিয়ামটি দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীর উপর নির্ভরশীল।

ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল লাইব্রেরি ও মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে অবস্থা আরও ভয়ঙ্কর। এখানে কোনো লাইব্রেরিয়ান নেই, কেয়ারটেকারও দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কাজ করছেন। ১৭টি বুকশেলফের মধ্যে কেবল ৯টি ব্যবহারযোগ্য, এবং অনেক বই ক্ষতিগ্রস্ত বা এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। নতুন বই ক্রয় বছরের পর বছর হয়নি।

তুলনামূলকভাবে, ঝিনাইদাহের বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান লাইব্রেরি ও মেমোরিয়াল মিউজিয়াম কিছুটা ভালো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিদিন ১৫০–১৬০ জন দর্শক আসে, এবং এখানে ৫,০০০-এর বেশি বই রয়েছে, যার মধ্যে অনেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক। তবে স্থায়ী কর্মী নেই; লাইব্রেরিয়ান এবং কেয়ারটেকার উভয়ই চুক্তিভিত্তিক।

নিচের টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ বীরশ্রেষ্ঠ স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগারের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:

বীরশ্রেষ্ঠ অবস্থান বইয়ের সংখ্যা স্মারক / সামগ্রী কর্মী বর্তমান চ্যালেঞ্জ
রুহুল আমিন নোয়াখালী কিছু বই সীমিত ছবি ও মেডেল ১ কেয়ারটেকার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত, বই অবহেলিত, কর্মী অপর্যাপ্ত
মুন্সী আবদুর রউফ ফরিদপুর ৫,১৭৯ ৩টি সামগ্রী ১ লাইব্রেরিয়ান + ১ কেয়ারটেকার কম দর্শক, স্থায়ী কর্মী নেই
মোস্তফা কামাল ভোলা শিশু ও বিজ্ঞান বই কোনো নেই ১ কেয়ারটেকার লাইব্রেরিয়ান নেই, বই ও শেলফ ক্ষতিগ্রস্ত
নুর মোহাম্মদ শেখ নড়াইল ৬,০০০ কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রী ১ কেয়ারটেকার মাঝে মাঝে বন্ধ, কর্মী সংকট
হামিদুর রহমান ঝিনাইদাহ ৫,০০০+ ছবি ও মূর্তিকলা ১ লাইব্রেরিয়ান + ১ কেয়ারটেকার স্থায়ী কর্মী নেই, সপ্তাহে দুই দিন বন্ধ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই স্মৃতি জাদুঘরগুলোকে কার্যকর ও আকর্ষণীয় করতে হলে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ, নিয়মিত প্রকাশনা এবং দর্শক আকর্ষণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ অপরিহার্য। এসব পদক্ষেপ ব্যতীত জাতীয় ঐতিহ্যের এই অমূল্য সংগ্রহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে হারিয়ে যেতে পারে, এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংযুক্ত ঐতিহাসিক জ্ঞান প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।