শেখ হাসিনা—শুধু একটি নাম নয়; বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিস্তৃত অধ্যায়ের নাম।
২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭—এই ধূলিমাখা ধরায় আপনার আবির্ভাব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ঘর আলো করে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটি সময়ের স্রোত পেরিয়ে একদিন হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘস্থায়ী ও বহুল আলোচিত চরিত্র।
জীবনের পথ আপনার জন্য কখনোই মসৃণ ছিল না। রক্তাক্ত ইতিহাস, স্বজন হারানোর বেদনা, নির্বাসন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্দোলন-সংগ্রাম—কত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আপনাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে! ১৭ মে ১৯৮১-তে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে যে পথচলা শুরু করেছিলেন, তা ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।
এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আপনার অর্জন যেমন আছে, তেমনি আছে বিতর্ক, সমালোচনা ও কঠিন রাজনৈতিক অধ্যায়ও। ইতিহাস কখনো একরৈখিক নয়—কোনো রাষ্ট্রনায়কের মূল্যায়নও কেবল প্রশংসা কিংবা নিন্দার একমাত্রিক আয়নায় করা যায় না।
তবু অস্বীকার করার উপায় নেই—আপনার রাজনৈতিক জীবনের কিছু অধ্যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে ছাপ রেখে গেছে।
১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া আপনার শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
জাতি আপনার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু প্রত্যাশা করেছিল—এখনো করে। সেই প্রত্যাশার অনেকটাই হয়তো পূরণ হয়েছে, অনেকটাই অপূর্ণ থেকেছে। আপনার চারপাশের মানুষ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের নানা কর্মকাণ্ড নিয়েও রয়েছে বিস্তর আলোচনা, প্রশ্ন ও সমালোচনা। ইতিহাস একদিন এসবেরও নির্মোহ মূল্যায়ন করবে।
আপনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। কখনো কখনো সেই দৃঢ়তা যেমন আপনাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে, তেমনি অতিরিক্ত জেদ ও অনমনীয়তার মূল্যও রাজনীতিতে দিতে হয়েছে—এ কথাটিও ইতিহাসের পাঠে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আপনার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে একই সঙ্গে দৃঢ়তা ও মানবিকতার যে বৈপরীত্য, সেটিই হয়তো আপনাকে এত আলোচিত করেছে। সমর্থকের কাছে আপনি আপসহীন নেত্রী; সমালোচকের কাছে আপনার শাসনামলের নানা সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ। আর ইতিহাসের কাছে আপনি—এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সংগঠন পরিচালনার সক্ষমতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার মানসিক দৃঢ়তা আপনাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে—যদিও এসব অগ্রগতির পাশাপাশি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা।
২০২৪ সালের আগস্টে আপনার রাজনৈতিক জীবনের এক নাটকীয় অধ্যায়ের অবসান ঘটে। ৫ আগস্ট আপনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন।
কিন্তু ইতিহাসের দরজা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।
ঈশান কোণের ঘন কালো মেঘ যেমন একদিন সরে যায়, তেমনি সময়ের স্রোতও একদিন বর্তমানের সব হিসাব-নিকাশকে নতুন করে মূল্যায়ন করে। আজকের পরাজয়, আজকের প্রাপ্তি কিংবা আজকের বিতর্ক—কোনোটিই ইতিহাসের শেষ কথা নয়।
আগামী দিনের পূর্বাকাশে কী সূর্য উঠবে, কোন রাজনৈতিক শক্তি কীভাবে ফিরে আসবে, কিংবা ইতিহাস কাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে—তার উত্তর সময়ই দেবে।
পাদটীকা—
বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলগুলোর একটি আওয়ামী লীগ। একটি রাজনৈতিক দলকে ঘিরে মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগ, স্মৃতি, ইতিহাস ও শিকড় রাতারাতি মুছে যায় না। রাজনৈতিক উত্থান-পতনের এই দেশে সময়ের সঙ্গে দল ও রাজনীতিরও পুনর্মূল্যায়ন হয়।
পরিশুদ্ধতা, আত্মসমালোচনা ও মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি ভবিষ্যতে নতুনভাবে মানুষের সামনে দাঁড়াবে কি না—সেটিও নির্ধারণ করবে সময় ও জনগণ।
বাঙালি হয়তো অনেক কিছুই ভুলে যায়, আবার অনেক কিছু গভীর মমতায় মনে রাখেও। ইতিহাসের পাতায় তাই শেষ কথা বলে সময়—কোনো ব্যক্তি, কোনো দল কিংবা কোনো মুহূর্ত নয়।
শেখ হাসিনা,
আপনার আশিতম জন্মতিথিতে রইল শুভেচ্ছা।
জীবনের এই প্রান্তে আপনার জন্য কামনা করি সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় জীবন।
আপনার জীবনের আলো-অন্ধকার, সাফল্য-ব্যর্থতা, অর্জন-বিতর্ক—সবকিছুর নির্মোহ মূল্যায়ন একদিন ইতিহাসই করবে।
শুভ জন্মদিন।


