খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই এপ্রিল ২০২৫, ১১:৩৩ এএম
বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের মৃত্যুর পর ২০২০ সালের উপনির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হন তার স্ত্রী সাহাদারা মান্নান শিল্পী। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিক ও সংসদ সদস্য হওয়ার পর থেকেই সাহাদারা নানা উপায়ে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা ও সম্পত্তি। তিনি বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা সম্পদের মালিক।
গত সরকারের চার বছরে সারিয়াকান্দি উপজেলায় বিভিন্ন প্রকল্পে ৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার কাজ হয়। এর ৭০ ভাগ প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব নেই। এছাড়া পদবাণিজ্যসহ নানা কারণে উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব ছিল। আত্মীয়স্বজনদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদে বসিয়ে তাদের বানিয়েছেন কোটিপতি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন নিয়ে দেওয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাহাদারা মান্নান শিল্পী বাঙালি নদী খননের বালু অবৈধভাবে বিক্রির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মূল বালুখেকোদের সঙ্গে তার সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেও তার ভাগ্নি ও ভাগ্নিজামাই সরকারের টিআর, কাবিখা, কাবিটাসহ সব ধরনের সরকারি সহযোগিতা বণ্টন করতেন। গত ১৫ বছরে তারা বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। চর জীবিকায়ন প্রকল্পের নামে কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
অস্তিত্বহীন প্রকল্পের নামে টাকা লোপাট
সারিয়াকান্দি উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের তত্ত্বাবধানে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আট কোটি ৮১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৪০টি কাবিটা প্রকল্প, ১০৬৯ মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের বিনিময়ে ১৫৬টি কাবিখা প্রকল্প, আট কোটি তিন লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে টিআর নামে ১৫৬০টি প্রকল্প, ১৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) নামে ৩২০টি প্রকল্প, তিন কোটি সাত লাখ টাকা ব্যয়ে গ্রামীণ মাটির রাস্তা এইচবিবিকরণ নামে চারটি প্রকল্প, সাত কোটি ৩২ লাখ ১৮ হাজার ১৮৯ টাকা ব্যয়ে ১৪টি সেতু বা কালভার্ট, ১০ কোটি ৬৭ লাখ ৪৩ হাজার টাকা ব্যয়ে তিনটি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের মাত্র ৫৬টি প্রকল্পের পাঁচ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি তালিকা পাওয়া যায়। যার শতকরা ৭০ ভাগ প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। উপজেলার বোহাইল ইউনিয়নের জয়বাবা মন্দিরের নামে আট লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। পৌর এলাকার কবরস্থান ও খেলার মাঠে মাটি ভরাটের নামে ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে। যার বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই। হাটশেরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে মাটি ভরাটের নামে পরপর চারবার ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে। যার কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। এছাড়া সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার মধ্যে তিন কোটি টাকা হাটশেরপুর এবং চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের যমুনা নদীর মধ্যে বিভিন্ন রাস্তা মেরামত এবং বাড়ির ভিটা উঁচুকরণ প্রকল্পের নামে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এসব প্রকল্পেরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়া অন্যান্য প্রকল্পের তালিকা চেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আবেদন করেও তালিকা মেলেনি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য
সারিয়াকান্দি উপজেলার ২৩টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত চার বছরে ৫০০টির মতো নিয়োগ হয়েছে। এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাহাদারা মান্নানের প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কয়েক মাস আগে চন্দনবাইশা ডিগ্রি কলেজের একটি নিয়োগ পরীক্ষায় সাহাদারা মান্নান উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ৬০ লাখ টাকা নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ এনে ফেসবুকে লাইভ দিয়েছিলেন বগুড়া শহর আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা আব্দুল মান্নান আকন্দ।
সাহাদারা মান্নান শিল্পী ডিও লেটার দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিকটাত্মীয়দের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি করেছেন। ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১২টি ইউনিয়নে একাধিক নেতাকে নৌকা প্রতীক দেওয়ার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি কিছু নেতাকে টিআর ও কাবিখা প্রকল্প বরাদ্দ দিয়ে পরিশোধ করেছেন। এ বিষয়ে হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইফাজ উদ্দিন বলেন, ইউপি নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলে এমপি আমার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। পরে একটি প্রকল্পের নামে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে অর্ধেক পরিশোধ করেছেন। আর বাকি অর্ধেক এখনো পরিশোধ করেননি।
সাহাদারা মান্নানের যত সম্পদ
নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মী জানান, সারিয়াকান্দি উপজেলায় ছয়তলা ভবনসহ সাহাদারা মান্নানের রয়েছে দুটি বাড়ি, পৌর বাজারে ১০ শতাংশ জমির ওপর মার্কেট, নারচী বাজারে ১০ শতাংশ জমির ওপর মার্কেট। সোনাতলা উপজেলায় পাঁচতলা ভবনসহ তার রয়েছে বেশ কয়েকটি বাড়ি। বগুড়া শহরের কলোনি এলাকায় তার রয়েছে তিনতলা আলিশান বাড়ি। সাবগ্রামে রয়েছে দুই বিঘা জমি, উপশহর এলাকায় রয়েছে জমিসহ বাড়ি। ঢাকার পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লট, ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট, মিরপুরে ফ্ল্যাটসহ কয়েকটি বাড়ি। আমেরিকাতেও তার বাড়ি রয়েছে বলে শোনা যায়। গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায় সাহাদারা মান্নানের রয়েছে ১৬ বিঘা জমির ওপর বহুতল ভবনসহ কয়েক কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পশুপাখির খামার।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাহাদারা মান্নান, তার ছেলে সাখাওয়াত হোসেন সজল ও ভাই মিনহাদুজ্জামান লিটনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ কয়েক ডজন মামলা হয়েছে। এরপর থেকে সবাই আত্মগোপনে রয়েছেন। মোবাইল ফোন বন্ধ রাখায় এসব দুর্নীতির ব্যাপারে সাহাদারা মান্নানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে সারিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিম মন্টু বলেন, সাবেক সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান শিল্পীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। তবে তিনি অনেক ভুল-ত্রুটি করেছেন। রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছেন। ত্যাগী নেতাকর্মীদের দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। এসবের কারণে আজ তাকে ভুগতে হচ্ছে।
সূত্র: যুগান্তর
খবরওয়ালা/এমএজেড
মন্তব্য