খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
দেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছরের আগস্ট মাসের শেষভাগেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, এই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে, এই মেগা প্রকল্পের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা স্পষ্ট করেছে এর পরিচালনা সংস্থা। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তা, পরিচালনা সক্ষমতা এবং ব্যবহৃত জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা আলোচনা ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাছান বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের খামখেয়ালি বা একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত হচ্ছে না। এটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ), রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা (Rostechnadzor) এবং বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অত্যন্ত কঠোর ও নিবিড় তদারকিতে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জার্মানি-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান (VO Safety) এই প্রকল্পের প্রতিটি ধাপের নিরাপত্তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখছে।
প্রকল্পের পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ওঠা প্রশ্ন সরাসরি খণ্ডন করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর মতো দক্ষ জনবল তৈরিতে বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে কাজ করছে। বিগত ১০ বছরে শত শত দেশীয় প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান ও অপারেটরদের রাশিয়ায় পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক মানের দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রুশ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে যৌথভাবে কাজ করার মাধ্যমে এনপিসিবিএল শতভাগ সক্ষম একটি অপারেটর প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করে তুলেছে। ফলে দেশীয় জনবল দিয়েই এই কেন্দ্র পরিচালনার পূর্ণ আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ রাখা ও এর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে জনমনে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে ড. মো. জাহেদুল হাছান জানান, রাশিয়ার সঙ্গে ইতিমধ্যে ‘স্পেন্ট ফুয়েল টেক ব্যাক’ বা ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার আনুষ্ঠানিক চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তিনি এর বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক নিয়ম ব্যাখ্যা করে বলেন, রিঅ্যাক্টর বা চুল্লি থেকে ব্যবহৃত জ্বালানি বের করেই সরাসরি অন্য দেশে পাঠানো যায় না বা পাঠানো সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে প্রথমে এই তেজস্ক্রিয় জ্বালানি রূপপুরের নিজস্ব ‘স্পেন্ট ফুয়েল পুল’-এ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা হবে এবং তা শীতল বা ঠান্ডা করা হবে। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী তা নিরাপদে রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে। ফলে বাংলাদেশ অংশে এই বর্জ্য স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, রূপপুরে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ও নিরাপদ ‘ভিভিইআর-১২০০’ (VVER-1200) মডেলের দুটি চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর স্থাপনের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটির দুটি ইউনিট যখন পুরোদমে চালু হবে, তখন জাতীয় গ্রিডে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে এক বিশাল ভূমিকা রাখবে।