সংযুক্ত আরব আমিরাতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজকে সামনে রেখে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিক স্কিল ক্যাম্প শুরু করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সিরিজের কন্ডিশন, সম্ভাব্য উইকেটের ধরন এবং দীর্ঘ সময় ব্যাটিং-বোলিং করার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে চলছে এই প্রস্তুতি। নেটে ব্যাটারদের পাশাপাশি বোলাররাও নিজেদের দক্ষতা ও স্ট্যামিনা ঝালিয়ে নিচ্ছেন।
দলের অনুশীলনে ব্যবহার করা হচ্ছে স্পিন বোলিং মেশিন। পেসারদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ স্ল্যাবও। এসব অনুশীলনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের উইকেট ও বোলিং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ক্রিকেটাররা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার আগে দল মোট ছয়টি স্কিল ট্রেনিং সেশন পাবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে সম্ভাব্য স্পিন-সহায়ক উইকেটের কথা মাথায় রেখে স্পিন বোলিং মেশিনে অনুশীলন বাড়ানো হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আশরাফুল জানান, এই প্রস্তুতি শুধু আফগানিস্তান সিরিজকে কেন্দ্র করে নয়। প্রধান কোচ ফিল সিমন্স নিয়মিতই এমন বিশেষ অনুশীলনের আয়োজন করেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের আগেও বোলিং মেশিন ও পেসারদের জন্য স্ল্যাব ব্যবহার করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, টেস্ট স্কোয়াডের ক্রিকেটাররা আগে থেকেই ফিটনেস ও ব্যক্তিগত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে দলীয়ভাবে স্কিল সেশন শুরু হয়েছে এখন। আফগানিস্তান স্পিনবান্ধব উইকেট তৈরি করতে পারে—এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ব্যাটিংয়ে জোর
মিরপুরের অনুশীলনে ব্যাটারদের নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন আশরাফুল। বিশেষ করে মুশফিকুর রহীমসহ দলের অভিজ্ঞ ব্যাটারদের উইকেটে দীর্ঘ সময় থাকার মানসিকতা তৈরির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
আশরাফুল জানান, সেদিনের অনুশীলন ছিল বেশ দীর্ঘ। লাঞ্চের আগে প্রায় দুই ঘণ্টা এবং বিরতির পর আরও দেড় ঘণ্টা ক্রিকেটাররা কাজ করেন। ব্যাটারদের লক্ষ্য ছিল দীর্ঘ সময় ক্রিজে টিকে থাকার অভ্যাস তৈরি করা। একই সঙ্গে বোলারদেরও দীর্ঘ স্পেল করার মতো স্ট্যামিনা ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
টেস্ট ক্রিকেটে ধৈর্য ও মনোযোগের গুরুত্ব আলাদা। তাই দ্রুত রান করার পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার সক্ষমতা গড়ে তোলাকেই এই মুহূর্তে প্রস্তুতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নাহিদ রানাকে নিয়ে অনিশ্চয়তা
চোটের কারণে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে খেলতে পারছেন না পেসার নাহিদ রানা। বর্তমানে তিনি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন। ওয়ানডে সিরিজের আগে তিনি পুরোপুরি ফিট হতে পারবেন কি না, সেটি এখনই নিশ্চিত নয়।
আশরাফুল জানান, ওয়ানডে সিরিজে রানাকে পাওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান কোচ, অধিনায়ক ও নির্বাচকেরা। তবে রানার অনুপস্থিতি নিয়ে দলের পেস আক্রমণে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখছেন না তিনি। তার মতে, দলের অন্য পেসাররাও সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রসঙ্গ টেনে আশরাফুল বলেন, নাহিদ রানা ছাড়াই বাংলাদেশ একটি টেস্টে দারুণ পারফরম্যান্স করে জয় পেয়েছিল। পরের টেস্টেও পেসাররা ভালো লড়াই করেছেন। ফলে দলে যারা সুযোগ পাচ্ছেন, তারা নিজেদের সামর্থ্য তুলে ধরছেন বলেই মনে করেন তিনি।
আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন জাকের
দীর্ঘ বিরতির পর জাতীয় দলে ফিরে আসা জাকের আলী অনিককেও অনুশীলনে আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে আশরাফুলের। অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্টের আগে জাকেরের ব্যাটিং অনুশীলনও ভালো ছিল বলে জানান তিনি।
এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে ‘এ’ দলের হয়ে খেলার সময়ও রান পেয়েছেন জাকের। সব মিলিয়ে তার ব্যাটিংয়ে আগের আত্মবিশ্বাসী ছন্দ ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন ব্যাটিং কোচ।
মূল একাদশে সুযোগ পেলে জাকের নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলেও আশাবাদী আশরাফুল।
ভিন্ন উইকেটের জন্যও প্রস্তুতি
সিরিজের প্রস্তুতিতে শুধু স্পিনবান্ধব উইকেট নয়, ভালো ব্যাটিং উইকেটের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। জাপানে সাম্প্রতিক নারী ক্রিকেটের ম্যাচগুলোতে বড় সংগ্রহ দেখা গেছে। সেখানে ব্যাটে বল ভালোভাবে আসার পাশাপাশি আউটফিল্ডও দ্রুতগতির হওয়ায় বাউন্ডারি পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকে।
বাংলাদেশের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে অবশ্য রান ১৪০-এর ঘরে আটকে ছিল। ভেজা আউটফিল্ডের কারণে বাউন্ডারি পাওয়া কঠিন হওয়ায় স্কোর কম হয়েছে বলে জানান আশরাফুল। পরবর্তী ম্যাচে রান বাড়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার সঙ্গে কোচিং স্টাফদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। ভালো ব্যাটিং উইকেট হলে কীভাবে ২০০ বা তার বেশি রান করা যায়, আবার মন্থর উইকেটে ১৪০ থেকে ১৬০ রান করেও কীভাবে ম্যাচ জেতার সুযোগ তৈরি করা যায়—দুই ধরনের পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।
সাদমানের ছন্দ ফেরার অপেক্ষা
টেস্টে সাম্প্রতিক সময়ে সাদমান ইসলাম প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা দেখাতে না পারলেও তার সামর্থ্য নিয়ে আশরাফুলের আস্থা রয়েছে। দেশের হয়ে ৩০টি টেস্ট খেলা সাদমান দীর্ঘদিন ধরে এই ফরম্যাটেই মনোযোগ দিয়ে আসছেন। তার টেস্ট ক্যারিয়ারে রয়েছে দুটি সেঞ্চুরি।
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে কয়েক ইনিংস আগেই টানা দুটি ৮০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। ফলে সাম্প্রতিক কিছু ইনিংসে প্রত্যাশিত রান না এলেও সাদমান যে ভালো ফর্মে ফিরতে পারেন, তার প্রমাণ আগেও পাওয়া গেছে।
আশরাফুলের মতে, সাদমান নেটে কঠোর পরিশ্রম করছেন এবং ব্যাটিংয়ের যেসব জায়গায় টেকনিক্যাল সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ টেস্ট অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুতই তিনি আবার রান করতে পারবেন বলে আশাবাদী বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ।
আফগানিস্তান সিরিজের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতির মূল বার্তাটা তাই পরিষ্কার—শুধু নির্দিষ্ট কোনো প্রতিপক্ষ বা একটি ধরনের উইকেট নয়, সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখতে চাইছে দল। দীর্ঘ সময় ব্যাটিং, নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং ভিন্ন কন্ডিশনে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই সামনে সিরিজের প্রস্তুতিতে বড় গুরুত্ব পাচ্ছে।


