খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড ঢাকার পূর্বাচল উপশহরের কাছে ৩১৪ বিঘা জমি কিনেছে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রতিটি প্লটের জন্য জমির উন্নয়ন ফি বাবদ প্রায় ৪ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এর বাইরে জমির শেয়ারের দাম এবং অন্যান্য খরচ তো আছেই। এখন আবাসন কোম্পানির মতো জমি বেচাকেনা করেও নিজেদের ‘অলাভজনক প্রতিষ্ঠান’ দাবি করে কর-এ বিশেষ সুবিধা চেয়েছে সংগঠনটি।
এই সুবিধা পেলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হলেও তাদের রেজিস্ট্রেশন খরচ কমে যাবে। এছাড়াও জমির হস্তান্তর খরচ কমানোর জন্য জমির শ্রেণি পরিবর্তনেরও আবদার করেছে এই সমিতি। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে এ বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। এনবিআর সূত্র থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, নতুন উৎসে কর বিধিমালায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এছাড়া আয়কর আইন বিধিতে জমির শ্রেণি ও কোন এলাকার জন্য কেমন করহার হবে, তাও নির্ধারিত আছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী জমি ক্রয়-বিক্রয় বা শেয়ার হস্তান্তরের খরচ ‘বেড়ে যাওয়ায়’ বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি মোটা দাগে বিশেষ কর সুবিধা চেয়েছে। এনবিআরে পাঠানো চিঠিতে তারা বলেছে যে, এটি একটি ‘অলাভজনক সংস্থা’। এনবিআরের আইনে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কথা থাকলেও ‘অলাভজনক’ বলে আলাদা কিছু নেই। দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞায় ‘বিনিময় ছাড়া কার্য সম্পাদন’ এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই সংগঠনটি এরই মধ্যে প্রত্যেক শেয়ার গ্রহীতার কাছ থেকে ভূমি উন্নয়ন বাবদ অর্থ সংগ্রহ করেছে এবং যারা চাঁদা দিয়েছেন, তাদের জমি আলাদা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইন অনুযায়ী এনবিআরের দায়িত্ব কর আদায় করা। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সংগঠনটির কর সুবিধা চাওয়া আইনত সাংঘর্ষিক। এনবিআরের উচিত আইন অনুযায়ী যে কর আসবে, তা আদায় করা। প্রশাসন ক্যাডারদের আবাসনে কর অব্যাহতি সুবিধা দিলে ভবিষ্যতে এটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
এনবিআরে পাঠানো চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডাররা আবাসন তৈরির জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের খিলক্ষেত থানাধীন কুড়িল-৩০০ ফিট রাস্তার এক কিলোমিটার উত্তরে তলনা, ডুমুনি, মস্তুল, বাওথার ও ঢেলনা মৌজায় ৩১৪ বিঘা জমি কিনেছেন। এই জমি কোনো উন্নয়ন ছাড়াই সাফ কবলা রেজিস্ট্রি মূলে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই জমিগুলো ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ বা ‘ঘ’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয় দাবি করে চিঠিতে একে ‘ঙ’ শ্রেণিভুক্ত করার আবেদন জানানো হয়েছে। যদিও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে যে এই জমি ‘ঘ’ শ্রেণিভুক্ত। তাই জমির শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য তারা এনবিআরের কাছে আবেদন করেছেন। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, যেহেতু জমিতে কোনো উন্নয়ন করা হয়নি, তাই উৎসে কর এবং অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে দ্বৈত কর পরিশোধ করতে হবে। এছাড়াও ব্যক্তিপর্যায়ে জমি হস্তান্তরে ভ্যাট দিতে হবে কি না এবং আবাসন কোম্পানি হিসেবে করহার প্রযোজ্য হবে কি না, সে বিষয়েও তারা এনবিআরের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
এ বিষয়ে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারদের বহুমুখী সমিতির পক্ষ থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে সমিতির জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে করহার আবাসন কোম্পানির মতো হবে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এনবিআর এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে এখানে আইনের বাইরে ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি কৌশলে ব্যাখ্যা দিয়ে কর সুবিধা দেয়, তাহলে তা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি দুটি আবাসন প্রকল্প—গ্রিনভ্যালি আবাসন ও খিলক্ষেত আবাসন—এর নামে শেয়ার আকারে প্লট বিক্রি করছে। এই দুটি প্রকল্পের জন্য মস্তুল, ডুমুনি, তলনা, ঢেলনা ও বাওথার মৌজায় আলাদাভাবে রেজিস্ট্রেশন ও উন্নয়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম ধরা হয়েছে মস্তুল মৌজায়। সেখানে সাড়ে ১৬ শতাংশ জমির দলিলমূল্য ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, রেজিস্ট্রেশন ফি ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা এবং উন্নয়ন ফি ৪ লাখ টাকা। এছাড়া ডুমুনি মৌজায় দলিলমূল্য ৯৯ লাখ, তলনা মৌজায় ৬৯ লাখ এবং ঢেলনা-বাওথার মৌজায় ৪৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি মৌজায় দলিলমূল্য ভিন্ন হলেও প্রতি সাড়ে ১৬ শতাংশ জমির উন্নয়ন ফি ৪ লাখ টাকা করেই ধরা হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেত আবাসন প্রকল্পের প্লট বরাদ্দের জন্য একটি বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজন করা হয় এবং ১৪২টি নিষ্কণ্টক প্লট সদস্যদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়। একইভাবে গ্রিনভ্যালি আবাসনের ক্ষেত্রেও সদস্যদের থেকে আলাদাভাবে রেজিস্ট্রেশন ও উন্নয়ন ফি বাবদ টাকা নেওয়া হয়েছে। ১০ কাঠার প্লটের জন্য সদস্যদের কাছে পে-অর্ডারও চাওয়া হয়েছে।
বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির চিঠির বিষয়ে এনবিআর কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, এবারের আয়কর আইন এবং পরিপত্রে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।
একই বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি সাবেক সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারের বক্তব্য জানার জন্য তাকে কল এবং খুদেবার্তা পাঠানো হয়েছে, কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি।
খবরওয়ালা/টিএসএন