খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী এই খরচ ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার কথা থাকলেও তা আগের জায়গাতেই বহাল রাখা হয়েছে। সরকারের এমন পিছু হটার তীব্র সমালোচনা করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি প্রশ্ন তুলেছে, এই সিদ্ধান্ত বদলের পেছনে আসলে কোন শক্তির প্রভাব কাজ করেছে? বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত একশ্রেণির আমলার অন্যায্য দাবির মুখে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলের সদিচ্ছা ভেস্তে যাওয়াকে তারা আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের এক ধরনের আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছে।
আজ রোববার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধায় কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অর্ধেক করা এবং এই ঋণ সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত। বৈষম্য দূর করা এবং জনগণের করের পয়সার অপচয় ঠেকানোই ছিল সরকারপ্রধানের এই অবস্থানের মূল যুক্তি। কিন্তু বাস্তবতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একশ্রেণির সুবিধাভোগী আমলাদের সংকীর্ণ স্বার্থের কাছে সেই নীতিগত অবস্থান শেষ পর্যন্ত হেরে গেল। ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, কোন মহলের প্রভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই সদিচ্ছা অকার্যকর হয়ে গেল, তাদের চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি।
বিবৃতিতে টিআইবি উল্লেখ করেছে, শুরু থেকেই তথাকথিত প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে উদ্দেশ্যমূলক শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছিল, তা ছিল চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যমূলক। মাত্র ২ হাজার ৪০০ কর্মকর্তার বাইরে একই ক্যাডার ও সমমর্যাদাভুক্ত অন্যান্য সার্ভিসে কর্মরত বিপুলসংখ্যক জনবলের জন্য এটি অত্যন্ত গ্লানিকর। এ জাতীয় পক্ষপাতদুষ্ট সুযোগ-সুবিধা সরকারি খাতের আন্ত-ক্যাডার ভারসাম্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। কিছু নির্দিষ্ট কর্মকর্তার জন্য এই সুযোগ বহাল রাখার ফলে প্রশাসনের ভেতরে পদ ও পদবির জন্য এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হচ্ছে, যা বাকিদের স্বাভাবিক কর্মস্পৃহাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, এক শ্রেণির আমলাসহ বিভিন্ন সংস্থার যারা বছরের পর বছর এই জাতীয় সুবিধা উপভোগ করে আসছেন, তারা কি প্রধানমন্ত্রীর ব্যয় সংকোচনের নানামুখী উদ্যোগ থেকে ইতিবাচক কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছেন? দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের কথা বিবেচনা না করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতিমাসে মোটা অঙ্কের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার অনুরোধ জানান তিনি।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক আরও মনে করিয়ে দেন যে, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে সরকার ইতোমধ্যে কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের যে বাধ্যবাধকতা আরোপের সুপারিশ টিআইবি করেছিল, তা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে নতুন সুযোগ-সুবিধা পেয়েও জনগণ কতটা দুর্নীতি ও বিড়ম্বনামুক্ত সেবা পাবেন, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেছে। দেশের চলমান আর্থিক সংকটের এই কঠিন সময়ে আমলাদের চাপের মুখে সরকারের এই নতি স্বীকার কোনো স্বাভাবিক দাবি পূরণের বিষয় নয়, বরং এটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।