আমিনবাজারের বিদ্যুৎ ২৫ টাকা কেন, প্রশ্ন চুক্তি নিয়ে

ঢাকার আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে প্রকল্প নিয়ে আগামী ২ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে, সেটি ঘিরে বিদ্যুতের দাম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় সাড়ে চার বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একই চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দর নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় শূন্য দশমিক ২১ মার্কিন ডলার। সে সময়কার বিনিময় হার অনুযায়ী টাকায় যার মূল্য ছিল ১৮ টাকার কিছু বেশি। এখন একই ডলারভিত্তিক দর প্রায় ২৫ টাকায় দাঁড়াচ্ছে।

অর্থাৎ, ডলারে বিদ্যুতের মূল দর কার্যত অপরিবর্তিত থাকলেও টাকার হিসাবে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। এর প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসছে গত কয়েক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন। তবে এখানেই শেষ নয়। প্রকল্পটি দীর্ঘ সময়েও উৎপাদনে না যাওয়ায় চুক্তির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং নতুন করে দর নির্ধারণের প্রক্রিয়াও আলোচনায় এসেছে।

চার বছর আগে যে চুক্তি হয়েছিল

২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজারে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের জন্য চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। একই সময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিও হয়।

চুক্তির আওতায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দর নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় শূন্য দশমিক ২১ ডলার। সে সময়ের বিনিময় হার বিবেচনায় প্রতি ইউনিটের দাম পড়েছিল ১৮ টাকার কিছু বেশি।

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী চীনা প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং নির্ধারিত পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ছিল প্রকল্পের জন্য জমি দেওয়া এবং নিয়মিত বর্জ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল ‘বিদ্যুৎ না হলে অর্থপ্রদান নয়’। অর্থাৎ কেন্দ্র উৎপাদনে না গেলে সরকারকে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে হবে না। কিন্তু প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে যেতে পারেনি।

একই দর, কিন্তু টাকার অঙ্ক অনেক বেশি

এখন প্রায় একই ডলারভিত্তিক দরে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আমিনবাজারের ল্যান্ডফিল থেকে চীনা কোম্পানির প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী দেড় বছরের মধ্যে প্রায় ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সরকার এই বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট প্রায় ২৫ টাকা দরে কিনবে।

এখানে মূল পার্থক্যটি তৈরি হয়েছে মুদ্রার বিনিময় হারে। ২০২১ সালে যে ডলারমূল্য টাকায় ১৮ টাকার কিছু বেশি ছিল, কয়েক বছর পর একই ডলারভিত্তিক দর টাকায় প্রায় ২৫ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে চুক্তিতে ডলারের দর অপরিবর্তিত থাকলেও বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত অর্থে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় বেড়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে তৈরি হওয়া এই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে?

বিলম্বের দায় নিয়েও প্রশ্ন

চুক্তি হওয়ার পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রটি বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারেনি। ২০২৬ সালে এসে আবার চূড়ান্ত অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন চুক্তির বিষয়টি সামনে এসেছে। এর মধ্যে টাকার বিনিময়মূল্য কমেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রায় নির্ধারিত ব্যয় টাকায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে বিনিয়োগকারী, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্য কোনো পক্ষের দায় থাকে, তাহলে সেই বিলম্বের ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত বিনিময় হারজনিত ব্যয় বাংলাদেশের সরকার ও বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর কতটা চাপানো যৌক্তিক—এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আর যদি প্রকল্পের মূল শর্তগুলো এত বছর পরও অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে নতুন করে চূড়ান্ত চুক্তির আগে বিদ্যুতের ডলারভিত্তিক দর পুনর্বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগ ব্যয়, প্রযুক্তির মূল্য, অর্থায়নের কাঠামো এবং ঝুঁকির হিসাব নতুন করে পর্যালোচনা করা সাধারণভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু বিদ্যুতের দাম দিয়েই কি হিসাব হবে?

প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার বিষয়টি নিঃসন্দেহে ব্যয়ের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পটির উদ্দেশ্য কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। এর সঙ্গে নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সরাসরি যুক্ত।

আমিনবাজারের ল্যান্ডফিলে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিপুল বর্জ্যের একটি অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য সুবিধা তৈরি হতে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকে মূলত এই পরিবেশগত ও নগর ব্যবস্থাপনা সুবিধাগুলোকেই প্রকল্পটির বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকারকে সরাসরি বড় অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না; চীনা প্রতিষ্ঠানটি কেন্দ্র নির্মাণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবে—এটিও সরকারের যুক্তির অংশ।

তবে এসব সুবিধার অর্থনৈতিক মূল্য কত, সেটি আলাদাভাবে হিসাব করা জরুরি। বর্জ্য অপসারণে সম্ভাব্য সাশ্রয়, ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনার সুবিধা, পরিবেশগত ক্ষতি কমার মূল্য এবং বিদ্যুৎ কেনার মোট ব্যয়—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলেই প্রকল্পটির প্রকৃত আর্থিক চিত্র পাওয়া যাবে।

ভবিষ্যতের ঝুঁকি কোথায়

‘বিদ্যুৎ না হলে অর্থপ্রদান নয়’ শর্তটি সরকারের জন্য উৎপাদন-পূর্ব ঝুঁকি কমায়। কিন্তু কেন্দ্র চালু হওয়ার পর পরিস্থিতি ভিন্ন। বিদ্যুতের দর যদি ডলারে নির্ধারিত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হলে টাকায় বিদ্যুতের দামও বাড়তে পারে।

ফলে প্রকল্পটির ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার যে অর্থে বিদ্যুৎ কিনবে, শেষ পর্যন্ত সেই অর্থের উৎস রাষ্ট্রীয় কোষাগার, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক কাঠামো এবং ভোক্তাদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই কারণেই ২০২১ সালের দর এবং ২০২৬ সালের টাকার হিসাবে দামের পার্থক্যটি শুধু একটি বিনিময় হারজনিত বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ব্যয়ের প্রশ্নও।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবেশগত সুবিধা রয়েছে—এ নিয়ে দ্বিমত কম। কিন্তু সেই সুবিধার পাশাপাশি বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য, মুদ্রা ঝুঁকি, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিলম্ব এবং চুক্তির শর্তও স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত আমিনবাজার প্রকল্পটি সফল হবে কি না, তার বড় পরীক্ষা হবে দুটি জায়গায়—নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়া। একই সঙ্গে ২৫ টাকা ইউনিট দরের পেছনে সরকারের মোট আর্থিক দায় কত হবে, সেটিও জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়, এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ব্যয়ের হিসাব।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।