রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত চতুর্থ বছরে পদার্পণ করলেও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার বিভীষিকা থামছে না। গত রবিবার ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে খনি শ্রমিকদের বহনকারী একটি বাসে রাশিয়ার আত্মঘাতী ড্রোন হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে জ্বালানি ও খনি খাতের নিরপরাধ কর্মীদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে নিন্দার ঝড় তুলেছে।
হামলার বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী ডেনিস শেমহাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে এক বার্তার মাধ্যমে এই হামলার পৈশাচিকতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দিনিপ্রো অঞ্চলের তেরনিভস্কা শহরে খনি থেকে কাজ শেষে ফেরার পথে শ্রমিকদের বাসটি লক্ষ্য করে রুশ বাহিনী নিখুঁত নিশানায় ড্রোন হামলা চালায়। হামলার ভয়াবহতায় বাসটি সড়ক থেকে ছিটকে উল্টে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন ধরে যায়। ইউক্রেনীয় পুলিশ ও জরুরি পরিষেবার প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সড়কের পাশে শ্রমিকদের পুড়ে যাওয়া বাসের কঙ্কাল পড়ে আছে।
ইউক্রেনের বৃহত্তম বেসরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ডিটিইকে (DTEK) নিশ্চিত করেছে যে, হতাহতরা সবাই তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলেন। যারা প্রতিদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে ঘরে ফিরছিলেন, তাদের ওপর এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে সংস্থাটি।
নিচে রবিবারের হামলার পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| হামলার ধরণ | লক্ষ্যবস্তু | নিহতের সংখ্যা | আহতের সংখ্যা | এলাকা |
| ড্রোন হামলা | খনি শ্রমিকদের বাস | ১২ জন | ০৭ জন | তেরনিভস্কা, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক |
| মিসাইল/বোমা হামলা | মাতৃসদন ও আবাসিক ভবন | – | ০৯ জন | জাপোরিঝিয়া |
| হামলার সময় | ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ (রবিবার) | মোট ১৯ জন হতাহত | – | দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেন |
আবুধাবিতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পূর্বালগ্ন
বড় ধরনের এই হামলার খবর এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুদ্ধ বন্ধের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আগামী বুধ ও বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই আলোচনায় ইউক্রেন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই রাশিয়া সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউক্রেনের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে শীতকালকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইউক্রেনীয়দের মনোবল ভেঙে দিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও খনি অঞ্চলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে ক্রেমলিন।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ
প্রায় চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনের অর্থনীতি ও অবকাঠামো প্রায় ধ্বংসের পথে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন কিয়েভের ওপর শান্তি আলোচনার জন্য চাপ সৃষ্টি করলেও পুতিন সরকার মাঠ পর্যায়ে আক্রমণ কমিয়ে আনার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। বরং শীতকালীন বৈরী আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড অচল করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। রবিবারের এই ড্রোন হামলা কেবল একটি মর্মান্তিক ঘটনাই নয়, এটি প্রমাণ করে যে শান্তি আলোচনার পূর্বমুহূর্তেও যুদ্ধক্ষেত্র কতটা অনিশ্চিত ও বিপদসংকুল।



