একদিনের ইফতার আয়োজনের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত অনন্য। সাজানো হয়েছিল লাইন ধরে ইফতারি প্লেট, সঙ্গে নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার ও পানীয়। তবে, প্লেটের সামনে রাখা ছিল এক বিশেষ কৌটা, যা ‘সারপ্লাস বক্স’ নামে পরিচিত ছিল। এই বক্সের উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই আলাদা—যারা অতিরিক্ত খাবার নেবেন না বা কম খাবেন, তাদের জন্য এটি ছিল একটি সুযোগ। প্রতিটি অতিথিকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, আপনার অতিরিক্ত খাবার সারপ্লাস বক্সে রেখে যান, যা পরবর্তীতে এতিমদের মাঝে বিতরণ করা হবে।
এই ভাবনা নিয়ে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল হক গত বৃহস্পতিবার (২০ মার্চ) শহীদ পরিবার, সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনদের সম্মানে একটি বিশেষ ইফতার আয়োজন করেন। এখানে অতিথিদের অতিরিক্ত খাবার সংরক্ষণের জন্য সারপ্লাস বক্স রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে সেই খাবার দান করা যায় অন্যদের জন্য, বিশেষত এতিম ও দুস্থদের জন্য।
এমনই পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪০টি সারপ্লাস বক্সে জমা পড়েছিল প্রায় ১০০ জন শিশুর খাওয়ার পরিমাণ খাবার। ইফতারির পর, ডিআইজি রেজাউল হক নিজেই খাবারের বক্সগুলো তার গাড়িতে করে নিয়ে যান খুলনা সদর এলাকার একটি এতিমখানায়, যেখানে এই খাবারগুলো এতিমদের জন্য রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে।
ডিআইজি রেজাউল হকের এই অভিনব উদ্যোগে খুলনার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মুগ্ধ হয়েছে। এর আগেও, তিনি খুলনায় যোগদান করার পর পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের বদলি করার জন্য লটারির মাধ্যমে এক ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা করেছিলেন, যা আলোচনার সৃষ্টি করেছিল।
ইফতার মাহফিলে অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, ‘এটি একেবারে নতুন উদ্যোগ। এটি সব ইফতার মাহফিলে ছড়িয়ে দিতে পারলে অনেক খাবার যেটা আসলে মানুষ খেতে চায় না তা নষ্ট না হয়ে যাদের আসলে খাবার দরকার তাদের দেওয়া যাবে। এতে খাবার অপচয় না হয়ে বরং পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষের খাবারের জন্য সহায়ক হবে।’
ইফতার মাহফিলে অংশ নেওয়া খুলনা জেলা ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং দৈনিক যুগান্তরের ব্যুরো প্রধান আহমদ মুসা রঞ্জু বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগ আগে দেখিনি। এটা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ। এটির মাধ্যমে দুই দিকে উপকার হবে। অনেক সময় দেখা যায় প্লেটে থাকা কিছু আইটেম অনেকে খেতে চান না- ফলে বাধ্য হয়ে সে খাবার না খেয়ে বা আংশিক খেয়ে উঠে যান। ফলে খাবার অপচয় হয়। ডিআইজির এই উদ্যোগের ফলে সেই খাবার যদি খাওয়ার আগেই সারপ্লাস বক্সে উঠিয়ে রাখা যায় তাহলে দরিদ্র মানুষ বা পথশিশুদের মাঝে বিতরণ করা যাবে।’
খুলনা প্রেস ক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও একুশে টেলিভিশনের খুলনা প্রতিনিধি বলেন, ‘ডিআইজির বাংলোতে ইফতারে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটা সবার জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। প্রতিদিন বিভিন্ন ইফতারি অনুষ্ঠানে এ উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আসলে আমি আসার পরে তো এসপিদের সঙ্গেও সেভাবে গেটটুগেদার হয়নি। এছাড়া খুবই সিলেকটিভ লোকদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে একটি ইফতারির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আমি ভাবলাম- অনেকেই তো অনেক কিছু খায় না। অনেকে ইফতারিতে চপ খায়, আবার অনেকেই তা পছন্দ করে না।
যে কারণে ভাবলাম, এমন একটা বক্স যদি দেই তারা খাবারের আগেই সেখানে রাখতে পারবে যেটা খেতে চায় না। সে ধারণা থেকে কাজটা করা হয়েছে। উদ্বৃত্ত সেই খাবারগুলো ইফতারির সঙ্গে সঙ্গেই আমরা পার্শ্ববর্তী একটি এতিমখানায় শিশুদের সঙ্গে এবং পথশিশুদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে। পরে অনেকেই ফোন দিয়ে এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে নিউজ করার দরকার নেই, তবে বিভিন্নভাবে এ উদ্যোগ সব ইফতার মাহফিলে ছড়িয়ে দিতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।’
খবরওয়ালা/আরডি



