ইরানকে ৯০টি মিসাইল লঞ্চার দিতে চেয়েছিল রাশিয়া

রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সহযোগিতার গভীরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফাঁস হওয়া একগুচ্ছ গোপন প্রতিরক্ষা শিল্পের নথিতে দেখা গেছে, উন্নত প্রযুক্তির নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য ইরানকে ৯০টি আধুনিক লঞ্চার সরবরাহের পরিকল্পনা করেছিল মস্কো। ২০২৪ সালে তৈরি রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের অভ্যন্তরীণ নথিতে এই সরবরাহ পরিকল্পনার উল্লেখ পাওয়া গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত এসব লঞ্চার ইরানের হাতে পৌঁছেছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইউক্রেনের বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ডালাস অ্যানালিটিক্স’-এর মাধ্যমে সংগৃহীত নথিগুলো পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর হাতে আসে। এসব নথি বিশ্লেষণ করে রাশিয়া ও তেহরানের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার তথ্য সামনে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির আওতায় ‘এলএমইউআর’ নামের একটি শক্তিশালী গাইডেড মিসাইলের জন্য ৯০টি লঞ্চার সরবরাহের কথা ছিল। হেলিকপ্টার থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্র রুশ সামরিক বাহিনী ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করে আসছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

রাশিয়ার অন্যতম প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ভিম্পেল’-এর ২০২৪ সালের মে মাসে তৈরি করা একটি উৎপাদন সূচিতে এই সরবরাহ পরিকল্পনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ‘কে-১০’ নামে একটি রপ্তানি চুক্তির অধীনে ৯০টি লঞ্চারের অর্ডার দেখানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পৃথক অভ্যন্তরীণ নথিতেও ‘কে-১০’ বলতে ইরানকে বোঝানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে উৎপাদনসংক্রান্ত এসব নথি থেকে লঞ্চারগুলো তৈরির পরিকল্পনা ও অর্ডারের বিষয়টি জানা গেলেও সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, রাশিয়া ইরানকে ৯০টি লঞ্চার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল—এমন তথ্যের ভিত্তি থাকলেও সেগুলো বাস্তবে তেহরানে পৌঁছেছিল কি না, তা এখনো অস্পষ্ট।

এর আগে ২০২৩ সালে ইরানের উদ্দেশে ছয়টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান পাঠানোর তথ্যও সামনে এসেছিল। রুশ উৎপাদনসংক্রান্ত একটি পৃথক তালিকার সঙ্গে প্রকাশ্যে আসা ওই সরবরাহের তথ্যের মিল পাওয়া যায়। ফলে ফাঁস হওয়া নথির মাধ্যমে রাশিয়া-ইরান সামরিক লেনদেনের আরও কিছু দিক যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে রাশিয়ার সম্ভাব্য লাভ

ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রাশিয়ার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা থেকে মস্কো উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে রাশিয়ার মতো বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পায়। তেল বিক্রি থেকে বাড়তি আয় রুশ সরকারের রাজস্ব বাড়াতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সামাল দেওয়া এবং যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় এই অতিরিক্ত অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আরেকটি প্রভাব পড়ছে ইউক্রেনের সামরিক পরিস্থিতিতে। পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক মনোযোগ ও অস্ত্র সরবরাহের অগ্রাধিকার একাধিক সংঘাতের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ায় কিয়েভের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর সংগ্রহ নিয়ে ইউক্রেনকে বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।

রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটন ও ইউরোপের ভিন্ন অবস্থান

ইরানের প্রতি রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অবস্থানে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসে দাবি করেছিলেন, ইরানকে সহায়তার ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা খুবই সীমিত, এমনকি প্রায় নেই বললেই চলে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার কৌশল থেকেও ট্রাম্প প্রশাসন মস্কোর ভূমিকা নিয়ে এমন অবস্থান নিতে পারে। তবে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।

ইউরোপীয় গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থান ও স্থাপনা শনাক্ত করতে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি সরবরাহ করছে রাশিয়া। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বিস্ফোরকবাহী ড্রোন তেহরানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও সতর্ক করেছে ইউরোপের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা। এসব তথ্য রাশিয়ার প্রকাশ্য অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর ঘনিষ্ঠ হয়েছে মস্কো-তেহরান সম্পর্ক

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কো ও তেহরানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে রাশিয়ার জন্য ইরান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাহেদ আক্রমণাত্মক ড্রোন সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। ইউক্রেনের বিভিন্ন সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্ষেত্রে এসব ড্রোন ব্যবহার করেছে রুশ বাহিনী।

পরবর্তী সময়ে রাশিয়া নিজস্ব ভূখণ্ডে শাহেদ প্রযুক্তির ড্রোন উৎপাদনও শুরু করে। এতে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা শুধু সরঞ্জাম কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রযুক্তি ও উৎপাদনসংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে মস্কো। ২০২৫ সালে দুই দেশ একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে অভিন্ন নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার স্বাক্ষরিত চুক্তির মতো এক দেশের ওপর হামলাকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করে পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা এতে রাখা হয়নি।

চুক্তিতে সরাসরি পারস্পরিক প্রতিরক্ষার নিশ্চয়তা না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বেড়েছে। চলতি অক্টোবর মাসেই রাশিয়া ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তিনটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। এসব বৈঠক দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে পারস্পরিক যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনেও চাপে রাশিয়া

ইরানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে রাশিয়াকে কূটনৈতিক ও উৎপাদনগত—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এড়াতে চায় মস্কো। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যোগাযোগ এবং ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইরানকে সামরিক সহায়তার প্রশ্নে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে দেশটি।

অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা মেটাতে গিয়ে রাশিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করা দেশটির জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

ফাঁস হওয়া নথিতে এই উৎপাদনসংক্রান্ত সংকটেরও ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে লেখা একটি চিঠিতে ‘ভিম্পেল’ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহে বিলম্বের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। চিঠিতে বলা হয়, যন্ত্রাংশ সময়মতো না পাওয়া গেলে ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের সংযোজন ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় নির্ধারিত সরবরাহ কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ফাঁস হওয়া নথিগুলো রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার সরবরাহের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে উৎপাদন সূচি, অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্র এবং দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দেয়, ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে মস্কো ও তেহরানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমীকরণ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।