আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে তালেবান সরকার। এ চিকিৎসাপদ্ধতি ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়—এমন যুক্তিতে চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচার বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এর ফলে দেশটিতে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশায় থাকা শত শত মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্তের কারণে বিশেষ করে দুর্ঘটনা, বিস্ফোরণ ও বিভিন্ন ধরনের আঘাতে দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর জালালাবাদে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চিকিৎসা চালু করতে স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছিল একটি চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা। কর্মসূচিটি চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই তালেবান কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তা বন্ধ হয়ে যায়।
কর্নিয়া হলো চোখের সামনের স্বচ্ছ স্তর, যার মধ্য দিয়ে আলো চোখের ভেতরে প্রবেশ করে। রোগ, সংক্রমণ কিংবা গুরুতর আঘাতে এই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়ার পরিবর্তে দাতার সুস্থ কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা বা উন্নত করা সম্ভব। তবে অস্ত্রোপচারের ফলাফল নির্ভর করে চোখের সামগ্রিক অবস্থা ও ক্ষতির মাত্রার ওপর।
বাড়ছে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা
কাবুলের নূর চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক নূর জামান হাশিম জানান, তালেবান কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার আগে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁদের দল ৯০টি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করেছিল। হাসপাতালটিতে এ চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল।
অপেক্ষমাণ রোগীদের অধিকাংশই তরুণ-তরুণী। তাঁদের কেউ বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন, কেউ বিভিন্ন ধরনের আঘাতের শিকার হয়েছেন, আবার কেউ ঝালাইয়ের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এসব রোগীর জন্য কর্নিয়া প্রতিস্থাপন ছিল স্বাভাবিক জীবনে ফেরার একটি সম্ভাব্য পথ।
নূর জামান হাশিম বলেন, কয়েক দশকের সহিংসতায় আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চাহিদা পূরণ করার মতো পর্যাপ্ত চক্ষুবিশেষজ্ঞ দেশটিতে নেই। স্থানীয়ভাবেও প্রতিস্থাপনের উপযোগী কর্নিয়া পাওয়া কঠিন।
তিনি আরও জানান, তালেবান কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে অস্ত্রোপচার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। কঠোর শাস্তির আশঙ্কায় চিকিৎসকেরা সেই নির্দেশ অমান্য করতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে যাঁরা ইতিমধ্যে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের চিকিৎসা কবে শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তায় গড়ে উঠেছিল চিকিৎসাসেবা
কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের কর্মসূচিটির সঙ্গে যুক্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব পাকিস্তানি ডিসেন্ট অব নর্থ আমেরিকা (এপিপিএনএ)। সংস্থাটি ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের জন্য বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ করে আসছে। অঙ্গদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা এসব কর্নিয়া উপযুক্ত রোগীদের অস্ত্রোপচারে ব্যবহার করা হয়।
চলতি বছরের শুরুতে সংস্থাটি পাকিস্তানের বাইরে আফগানিস্তানেও এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে। এর ফলে দেশটিতে ১৫০টিরও বেশি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে তিনজন আফগান চক্ষুবিশেষজ্ঞকে পাকিস্তানের পেশোয়ারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এপিপিএনএর কর্নিয়া কর্মসূচির প্রধান এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জাফর মীর ফাউন্ডেশনের প্রধান ডা. ফাওয়াদ জাফর জানান, ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানে তাঁদের বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহের কর্মসূচিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রায় চার মাস আগে আফগানিস্তানেও কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। দেশটিতে শত শত মানুষের কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তালেবান সরকারের নির্দেশের কারণে উদ্যোগটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
২০২১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর তালেবান সরকার আফগানিস্তানে বিভিন্ন সামাজিক ও জনজীবনসংক্রান্ত বিষয়ে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নতুন এই সিদ্ধান্ত দেশটির বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, উপযুক্ত অস্ত্রোপচারকেন্দ্র এবং নিরাপদে সংগৃহীত দাতা কর্নিয়ার প্রয়োজন হয়। আফগানিস্তানে এসব সুবিধার সীমাবদ্ধতা আগে থেকেই রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তায় শুরু হওয়া কর্মসূচিটি সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণের সুযোগ তৈরি করেছিল।
এখন অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের পাশাপাশি স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেসব রোগী দেশের ভেতরে চিকিৎসা নিতে পারছেন না, তাঁদের বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তালেবান কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে কি না কিংবা কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের কর্মসূচি আবার চালু করার অনুমতি দেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সেইসব মানুষের ওপর, যাঁদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার পাওয়ার সুযোগ এখন বন্ধ হয়ে গেছে।


