খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ২:১৬ পিএম
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (LNG) টার্মিনালে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে চট্টগ্রাম জুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। ফলে বন্দরনগরীর পরিবহন খাত এক অভূতপূর্ব স্থবিরতার মুখে পড়েছে। দিনের বড় একটি অংশ ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পার করতে গিয়ে দৈনিক কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন হাজার হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস ও মাইক্রোবাসের চালক। আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় চরম আর্থিক অনটন ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবহন শ্রমিকদের।
নগরীর আকবরশাহের পাহাড়িকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন কিংবা ষোলশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশন—প্রতিটি গ্যাস পাম্পের চিত্রই এখন এক। ভোর থেকে হাজারো সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের দীর্ঘ লাইন আঁকাবাঁকা হয়ে নেমে গেছে প্রধান সড়কে।
সাধারণ সময়ে যে গ্যাস নিতে সময় লাগত মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট, বর্তমানে সেখানে ৫ থেকে ৮ ঘণ্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নগরের পাম্পগুলোর সামনে কথা হয় একাধিক চালকের সঙ্গে:
আবু তৈয়ব (অটোরিকশাচালক): “ভোর চারটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল ১০টা পার হলেও গ্যাস মেলেনি। রাতেও বিশ্রাম হয়নি, ঘুমিয়েছি গাড়িতেই। পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েই যদি দিনের অর্ধেক সময় শেষ হয়ে যায়, তবে রাস্তায় নামব কখন? মালিকের দৈনিক জমা মিটিয়ে সংসারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
মোহাম্মদ আবুল কাশেম (অন্য এক চালক): “গতকাল ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অল্প কিছু গ্যাস পেয়েছিলাম, যা ২ ঘণ্টা চলার পরই শেষ। বাধ্য হয়ে আজ ভোর ৬টায় আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি।”
মো. নাহিদ (মিনিবাস চালক): “চট্টগ্রাম-ফতেয়াবাদ রুটে বাস চালিয়ে দিনে সাধারণত ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু গ্যাস না পাওয়ায় গতকাল মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেছি।”
চালকদের এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে রাস্তায় কার্যকর গণপরিবহনের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি গন্তব্যে পৌঁছাতে সাধারণ যাত্রীদেরও পোহাতে হচ্ছে মারাত্মক ভোগান্তি। অনেকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকাচ্ছেন।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহে দেখা দিয়েছে বিশাল বড় শূন্যতা।
দৈনিক মোট চাহিদা: প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট
বর্তমান সরবরাহ (২৪ ঘণ্টা): মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট
দৈনিক মোট ঘাটতি: প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুট
এই বিশাল ঘাটতির প্রভাব পড়েছে কেজিডিসিএলের অধীনস্থ সব কয়টি প্রধান বিতরণ খাতে:
১. বিদ্যুৎ খাত: সাধারণ চাহিদা দৈনিক ১৫ কোটি ঘনফুট, যা বর্তমানে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
২. শিল্পকারখানা: দৈনিক চাহিদা ৯ কোটি ঘনফুট, তবে সরবরাহে ঘাটতি বিদ্যমান।
৩. আবাসিক খাত: দৈনিক চাহিদা ৬ কোটি ঘনফুট, সেখানেও দেখা দিয়েছে নিম্নচাপ।
৪. সিএনজি খাত: দৈনিক চাহিদা ৫ কোটি ঘনফুট, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী এই খাতের চালকেরা।
সংকটের সূত্রপাত ঘটে গত ২১ জুলাই, যখন মহেশখালীতে মার্কিন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘একসিলারেট এনার্জি’ পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে। এই দুর্ঘটনার পর পরই জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ একধাক্কায় মারাত্মকভাবে নেমে যায়।
কেজিডিসিএলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে পেট্রোবাংলা কেজিডিসিএলকে যে পরিমাণ গ্যাস বরাদ্দ দিচ্ছে, সেটাই বন্টন করা হচ্ছে। ফলে কোনো খাতেই শতভাগ সরবরাহ রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে আশার কথা হচ্ছে, দুর্ঘটনাকবলিত টার্মিনালে ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল মেরামতের কাজ জোরকদমে চালিয়ে যাচ্ছে। কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষের ধারণা, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই টার্মিনালে পুনর্মেরামত কাজ শেষ হবে এবং চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। ডিস্ট্রিবিউশন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই ক্রান্তিকাল মানিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য