খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
কুষ্টিয়া কোর্ট রেলওয়ে স্টেশনে এক অদ্ভুত ও অপ্রীতিকর ঘটনার সাক্ষী হলেন সাধারণ যাত্রীরা। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের বগিতে চড়াকে কেন্দ্র করে ট্রেনের স্টাফ ও যাত্রীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এ সময় ট্রেনের কন্ডাক্টর গার্ডের দেওয়া ধারালো ছুরির আঘাতে এক বৃদ্ধ ও তাঁর ছেলে রক্তাক্ত হন। ঘটনাটি জানাজানি হতেই স্টেশনে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও যাত্রীরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। উত্তেজনা তুঙ্গে উঠলে গণধোলাইয়ের ভয়ে ট্রেনের লোকোমাস্টার (চালক) এবং পরিচালকসহ সব স্টাফ ট্রেন ফেলে রেখে চম্পট দেন।
শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। হামলায় আহত দুজন হলেন চুয়াডাঙ্গা জেলার বাসিন্দা আব্দুর রহিম (৬০) এবং তাঁর ছেলে শফিউল আওয়াল সুমন (৪০)। ঘটনার জেরে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে স্টেশনটিতে সুন্দরবন এক্সপ্রেস আটকে থাকে, যার ফলে চরম গরমে চরম ভোগান্তির শিকার হন হাজারো যাত্রী।
রেলওয়ে পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, ট্রেনটি কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনে থামার পর প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা তুলনামূলক কম থাকায় ওঠানামা করতে কিছুটা সমস্যায় পড়েন আব্দুর রহিম ও তাঁর পরিবার। তাঁর সঙ্গে থাকা বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ট্রেনের বগিতে ওঠার সময় নির্দিষ্ট আসন না পেয়ে বাধ্য হয়ে পাশেই থাকা একটি এসি বগিতে উঠে পড়েন তারা। এ সময় এসি বগির টিকিট না থাকায় তাদের ওপর তীব্র মেজাজে চড়াও হন ট্রেনের কন্ডাক্টর গার্ড আবদুল্লাহ আল মামুন। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে ওই ট্রেনের স্টাফ সুমন ও তাঁর মাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বাবা-ছেলে প্রতিবাদ জানালে মামুন মারাত্মক ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো ছুরি বের করে তাদের ওপর হামলা চালান। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আব্দুর রহিম ও শফিউল উভয়ের হাত কেটে রক্তাক্ত হয়।
ঘটনার পরই উপস্থিত ক্ষুব্ধ জনতা আহত দুজনকে উদ্ধার করে দ্রুত কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইকবাল হাসান জানান, আহত বাবা ও ছেলের দুজনেরই হাতে কয়েক টি সেলাই দিতে হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার পর তাদের জরুরি বিভাগ থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, যাত্রীর ওপর এমন বর্বর হামলার খবর প্ল্যাটফর্মে ছড়াতেই মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা রূপ নেয় বিশাল বিক্ষোভে। বিক্ষুব্ধ জনতা ট্রেনের চারপাশ ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে শুরু করেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ট্রেনের চালক, গার্ড ও অন্য সব কর্মচারীরা দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে যান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন অর রশিদ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) প্রণব কুমার সরকার। তারা বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করতে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন এবং দোষী স্টাফের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দেন। প্রশাসনের শক্ত প্রতিশ্রুতি পেয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পর আন্দোলনকারীরা ট্রেনের পথ ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
কুষ্টিয়া কোর্ট রেলওয়ে স্টেশনের ইনচার্জ ইতি খাতুন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম আবদুল্লাহ আল মামুন এবং তিনি সুন্দরবন এক্সপ্রেসে কন্ডাক্টর গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবীর হোসেন মাতুব্বর ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার সরকার জানান, যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার কিংবা অন্য কারও পক্ষ থেকে কুষ্টিয়া মডেল থানা অথবা পোড়াদহ রেলওয়ে থানায় এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত মামলা দায়ের করা হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।