খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৩ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্তরোত্তর ব্যবহারের ফলে বিশ্বজুড়ে অতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টারের চাহিদা। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণকারী ও বিমা গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ১৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় তিনগুণে পৌঁছাতে পারে। তবে এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রসারের পেছনে দেখা দিয়েছে মারাত্মক কিছু ঝুঁকি। চাপগ্রস্ত জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড, চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সাইবার নিরাপত্তার সুগভীর ঝুঁকিগুলোর মুখোমুখি হয়ে বিশ্বজুড়ে কাজ করা বিমা কোম্পানিগুলো এখন বাধ্য হচ্ছে তাদের শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা করতে।
আন্তর্জাতিক বিমা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এওন পিএলসির (Aon Plc) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বাণিজ্যিক ঝুঁকি বিষয়ক প্রধান টেরেন্স উইলিয়ামস বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারগুলোতে এখন বিদ্যুৎ সরবরাহ সুনিশ্চিত রাখা এবং তা নিরবচ্ছিন্ন রাখাই প্রধান চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে বর্তমানে উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্যোগে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি ব্যাকআপ, মাইক্রোগ্রিড এবং হাইব্রিড জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
কিন্তু এসব বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত রয়েছে আগুন লাগার ভয়াবহ ঝুঁকি, দামি যন্ত্রপাতি বিকল হওয়া এবং জটিল রক্ষণাবেক্ষণ সংকট। তাছাড়া এআই প্রযুক্তির চাহিদার কারণে প্রতিটি সার্ভার র্যাকে বিদ্যুৎ খরচের ঘনত্ব অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কুলিং বা শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায়। উন্নত প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে স্থানগুলোতে সংবেদনশীল ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি বসানো হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি সাধারণ বাণিজ্যিক ভবনের চেয়ে শতগুণ বেশি। এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় এওন পিএলসি তাদের ‘ডেটা সেন্টার লাইফসাইকেল ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রাম’-এর ঝুঁকি কাভারেজ সীমা ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। নকশা অনুমোদন ও নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা পর্যন্ত প্রতি পদে পদে এসব ঝুঁকি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করছে বিমা প্রতিষ্ঠানটি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ভৌগোলিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবও ডেটা সেন্টারের নিরাপদ স্থায়িত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান এইচডিআই গ্লোবাল এসই (HDI Global SE) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আবহাওয়া পরিস্থিতি ডেটা সেন্টারগুলোর নিরাপত্তা নীতি বদলে দিচ্ছে।
টোকিওর মতো বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তিকেন্দ্রে প্রতিনিয়ত ভূমিকম্প, টাইফুন ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা থাকে। সেখানে ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার গতিবেগের ঝড় এবং রেকর্ড পরিমাণ তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে। আবার জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, ২০৮১ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মুম্বাই ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুরে বছরের প্রায় ২০০ দিনেরও বেশি সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে অবস্থান করবে।
ঐতিহ্যবাহী সাধারণ বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণশৈলী দিয়ে এত সংবেদনশীল প্রযুক্তি সুরক্ষা করা একেবারেই অসম্ভব। এজন্য বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থান নির্বাচনে নদীভাঙন, প্লাবনভূমি, দাবানল ও ভূকম্পন ঝুঁকি মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছে। একই সাথে অবকাঠামোগত নিরাপত্তায় জরুরি ছাদে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, উঁচু মেঝে, সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি মেঝের উচ্চতার ওপর স্থাপন এবং অভ্যন্তরীণ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা চালুর জন্য কড়া তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান জমি ও বিদ্যুতের সংকট কাটাতে ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারীরা এখন মূল শহরের বাইরে দ্বিতীয় সারির শহরগুলোতে নতুন অবকাঠামো গড়ছেন। ফলে বিমা দেওয়ার আগে জলবায়ু সহনশীলতা, পর্যাপ্ত পানির মূল উৎস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও জরুরি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কঠোরভাবে যাচাই করা নিশ্চিতভাবেই বাধ্যতামূলক রূপ নিচ্ছে।
মন্তব্য