ভোলায় কৃষকদের জন্য সরকারি বরাদ্দ ইউরিয়া ও টিএসপি সার চোরাইপথে মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। নদীপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। গত কয়েক মাসে কোস্ট গার্ড ও পুলিশের পৃথক অভিযানে বিপুল পরিমাণ সার জব্দ এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। এতে কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত সার কোথায় যাচ্ছে এবং সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে অনিয়ম হচ্ছে—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পৃথক অভিযানে প্রায় ১৪১ মেট্রিক টন সার জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১২ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের গত তিন মাসের অভিযানে প্রায় ৫৫ মেট্রিক টন সারসহ সাতজন এবং মার্চ ও আগস্টে পুলিশের দুই অভিযানে প্রায় ৮৬ মেট্রিক টন সারসহ পাঁচজন আটক হন।
সর্বশেষ গত শনিবার বিকেলে তজুমদ্দিন উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা বাজারসংলগ্ন মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে একটি সন্দেহজনক ট্রলার থেকে প্রায় আট মেট্রিক টন বা ১৬০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। সারগুলো মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছে বাহিনীটি। অভিযান টের পেয়ে ট্রলারে থাকা চোরাকারবারিরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। ট্রলারটিও জব্দ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১২ আগস্ট চরফ্যাশন উপজেলায় গভীর রাতে একটি ট্রাক ও মাছ ধরার ট্রলার থেকে ২৯৩ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে পুলিশ। ওই ঘটনায় চারজনকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে সার ট্রলারে তোলার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে আদালতে পাঠানো হয়।
সবচেয়ে বড় চালানগুলোর একটি ধরা পড়ে গত ৫ মার্চ ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাটে। সেদিন চারটি ট্রাকে থাকা এক হাজার ৪২০ বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি সার জব্দ করা হয়, যার পরিমাণ প্রায় ৭১ মেট্রিক টন। ট্রাকগুলো ইলিশা ফেরিঘাট থেকে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরী ঘাটের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিন চালক পালিয়ে গেলেও একজনকে আটক করা হয়। একই দিন বিকেলে ভোলার খেয়াঘাটে অবস্থিত বিসিআইসির গুদাম থেকে এসব সার ট্রাকে তোলা হয়েছিল বলে জানা যায়।
মনপুরা ও হাতিয়া অঞ্চলেও একই ধরনের পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ওই রুটে পাচারের সময় ৭৬০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। আবার গত মাসে চরফ্যাশন ও মনপুরা সীমানার চর নিজামে প্রায় তিন হাজার বস্তা সার পাচারের চেষ্টা স্থানীয় জেলেদের বাধার মুখে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সার পাচারের সঙ্গে কিছু অসাধু ডিলারের যোগসাজশ থাকতে পারে। কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার ডিলারদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় বিক্রি করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের পর্যায়ে কার্যকর বিক্রয়কেন্দ্র নেই। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ডিলার শহরে নামমাত্র দোকান রেখে কৃষকের কাছে সার সরবরাহের পরিবর্তে বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করছেন। সেখান থেকেই পাচারকারীদের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে।
ভোলার বিসিআইসির বাফার গুদামটি দক্ষিণাঞ্চলের সার সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখান থেকে ডিলাররা সার সংগ্রহ করেন। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, ডিলাররা নিজেরা না এসে প্রতিনিধির মাধ্যমে সার উত্তোলন করেন। এরপর সেই সার কৃষকের কাছে না গিয়ে বিভিন্ন ঘাট হয়ে নদীপথে পাচারকারীদের হাতে চলে যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
গত এক বছরে ভোলা থেকে সার পাচারের প্রবণতা বেড়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। আগে সড়কপথে পাচারের চেষ্টা করা হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা পথ বদলেছে। এখন মাছ ধরার বড় নৌকা, ট্রলার কিংবা বালু বহনকারী বাল্কহেড ব্যবহার করে নদীপথে সার সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ জলপথ ও উপকূলীয় এলাকার নানা ঘাট এ ক্ষেত্রে পাচারকারীদের সুবিধা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
কৃষক সংগঠনের নেতারা বলছেন, সরকারি হিসাবে সারের সংকট না থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় সার সময়মতো না পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে মৌসুমি ফসলের চাষের সময়ে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষককে বাড়তি দামে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. সাহাবুদ্দিন ফরাজী অভিযোগ করেন, সার পাচারের পেছনে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কাজ করছে। তাঁর দাবি, প্রশাসন কিছু চালান আটক করতে পারলেও সব চালান ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যেন নির্ধারিত কৃষকের কাছেই পৌঁছায়, সে জন্য ডিলার পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম জানিয়েছেন, নৌপথে চোরাচালান ও পাচার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহজনক নৌযান তল্লাশি এবং অবৈধ পণ্য জব্দের পাশাপাশি পাচারকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খাইরুল ইসলাম মল্লিক জানিয়েছেন, বর্তমানে জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। তবে সার পাচার ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রতি মাসে ডিলারদের সার উত্তোলন, বিক্রি ও মজুদের হিসাব পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যাতে জেলার বাইরে পাচার হতে না পারে, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে একের পর এক বড় চালান আটকের ঘটনায় শুধু পাচারকারীদের গ্রেপ্তার নয়, সার সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাটি আরও কঠোরভাবে তদারকির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছাচ্ছে কি না, ডিলাররা প্রকৃত কৃষকের কাছে তা বিক্রি করছেন কি না এবং গুদাম থেকে বের হওয়ার পর সার কোন পথে যাচ্ছে—এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে পাচারের সুযোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।



