কেরানীগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাদের বুড়িগঙ্গার তীর দখল করে ইট-বালুর গদি

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ও পোস্তগোলা সেতুর আশপাশে সরকারি জমি দখল করে ইট, বালু ও পাথরের ব্যবসা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। নদীর তীর থেকে সেতুর নিচ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য গদি ও দোকান। একই এলাকায় সেতুর জায়গা দখল করে শ্রমিক দল, তাঁতি দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের তিনটি রাজনৈতিক কার্যালয় স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন জায়গায় এসব ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের প্রভাবের কারণে দখল ও চাঁদা আদায়ের কার্যক্রম চলছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের কয়েকজন এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

সম্প্রতি হাসনাবাদ প্রান্তে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পোস্তগোলা সেতুর দুই পাশ ও নদীর তীরজুড়ে ইট, বালু ও পাথরের স্তূপ রাখা হয়েছে। কোথাও টিন ও বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। বড় ট্রাক ও ট্রলারে করে নিয়মিত নির্মাণসামগ্রী আনা-নেওয়া হচ্ছে। এতে নদীর তীরের স্বাভাবিক পরিবেশের পাশাপাশি সেতু ও আশপাশের সড়কে যান চলাচল এবং পথচারীদের চলাচলেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসনাবাদ সেতুর নিচ থেকে মোকামপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার এলাকায় ৫০ থেকে ৬০টি ছোট-বড় গদি রয়েছে। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রতিটি গদি থেকে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে প্রায় ১৫০টি ছোট দোকান থেকে মাসে তিন হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। তিনটি রিকশা গ্যারেজ থেকেও মোট ৩৮ হাজার টাকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, গদি, দোকান ও রিকশা গ্যারেজসহ বিভিন্ন খাত থেকে মাসে প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, আদায় করা অর্থের একটি অংশ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সোহেল রানা, সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ শাহিন এবং থানা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক আরমান হোসেনের নামও এ অভিযোগে এসেছে। তবে তিনজনই দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আগেও উচ্ছেদ হয়েছিল অবৈধ স্থাপনা

হাসনাবাদ ও পোস্তগোলা সেতুর নিচে দখল নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২০ সালে নদীর সীমানা পিলারের ভেতরে সেতুর নিচে গড়ে ওঠা পাথর ও বালুর ৫২টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ওই অভিযানে ২৫ জন ব্যবসায়ীর স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্ছেদের পরও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একই এলাকায় আবার নতুন করে গদি, দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে সরকারি জমি ও নদীর তীরের জায়গা দখলের পুরোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সেতুর জায়গায় তিন রাজনৈতিক কার্যালয়

পোস্তগোলা সেতুর জায়গা দখল করে শ্রমিক দল, তাঁতি দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের তিনটি রাজনৈতিক কার্যালয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, থানা শ্রমিক দলের সহসভাপতি মুজাহিদ ইসলাম ফারুক শ্রমিক দলের কার্যালয়টি পরিচালনা করেন। তাঁতি দলের কার্যালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন রনি। আর স্বেচ্ছাসেবক দলের কার্যালয়টি সভাপতি সোহেল রানা ও সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ শাহিনের অনুসারীরা পরিচালনা করেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কার্যালয়কে কেন্দ্র করে সেতু দিয়ে চলাচলকারী সিএনজি ও অটোরিকশা, সেতুর নিচের দোকান, নির্মাণসামগ্রীর গদি, রিকশা গ্যারেজ এবং নদীতীরের বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

স্থানীয়দের আরও দাবি, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সেলিম মেম্বারের ভাই মান্নান ও ভাতিজা অমিতেরও সেতুর নিচে গদি রয়েছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী আসিফ মাহমুদ এবং থানা শ্রমিক দলের সহসভাপতি মুজাহিদ ইসলাম ফারুকের নামও গদি মালিক হিসেবে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা তাদের স্বজনদের গদি ও দোকানের ক্ষেত্রে নিয়মিত ভাড়া দিতে হয় না। এসব স্থাপনায় অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

টাকা না দিলে বাধার অভিযোগ

কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, নিয়মিত টাকা না দিলে গদি বসানো, নির্মাণসামগ্রী রাখা কিংবা ব্যবসা পরিচালনায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। কারও কারও দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করেও বিভিন্ন গদি ও দোকান থেকে টাকা তোলা হয়।

তবে অভিযোগের বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সোহেল রানা বলেন, তিনি হাসনাবাদ এলাকায় থাকেন না। সেতুর নিচের দোকান কিংবা চাঁদা আদায়ের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, স্থানীয় নেতাকর্মীরাই সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করেন।

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ শাহিন বলেন, আগে ওই এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি ক্লাব ছিল। জুলাইয়ের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সরে গেলে স্থানীয় তাঁতি দল, শ্রমিক দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা সেখানে রাজনৈতিক কার্যালয় করেন। সরকারি জায়গায় স্থানীয় লোকজন দোকান ও গদি করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার জায়গা ফেরত নিতে চাইলে তারা সেগুলো ছেড়ে দেবেন। চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক আরমান হোসেনও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সেতুর নিচে তার কোনো দোকান নেই এবং দখল বা চাঁদাবাজির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তার নাম ব্যবহার করে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেটিও সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। সেখানে শ্রমিক দল, তাঁতি দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের তিনটি রাজনৈতিক কার্যালয় রয়েছে—এ তথ্য তিনি স্বীকার করলেও কারা টাকা আদায় করেন, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

সরকারি জমি ও নদীর তীরের জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক কার্যালয় স্থাপনের বিষয়টিও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২০২০ সালে উচ্ছেদ হওয়া স্থাপনা একই এলাকায় ফের গড়ে ওঠার অভিযোগ থাকায় নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর উচ্ছেদ কার্যক্রম ছাড়া নদীতীরের দখল ঠেকানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।