বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে ভার্চুয়াল সম্পদ ও ভার্চুয়াল মুদ্রাসংক্রান্ত আগের বিধিনিষেধ পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনা প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহকদের হিসাবের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা বা স্থানান্তরের মতো কার্যক্রম হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এ ধরনের লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নজরদারি বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নিষিদ্ধ এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে, সে বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রজ্ঞাপনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক বিনিময় হার ও প্রতিবেদন দাখিল, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেন, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ ও নিষ্পত্তি, বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব এবং ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার ওপেন পজিশন সীমা।
এ ছাড়া নস্ট্রো হিসাবের সমন্বয়, ফরওয়ার্ড লেনদেন, সোয়াপ এবং আমদানি বাণিজ্যে পণ্যমূল্যের ওঠানামাজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় হেজিংসংক্রান্ত নির্দেশনাও সমন্বিত নীতিমালায় রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি ভার্চুয়াল সম্পদ ও ভার্চুয়াল মুদ্রার বিনিময়, স্থানান্তর এবং লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার ও লেনদেনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান নতুন নয়। ২০২২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে জানানো হয়েছিল, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ভার্চুয়াল মুদ্রা অর্জনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে, বাংলাদেশে কিংবা বাংলাদেশের ভেতরে এ ধরনের লেনদেন অনুমোদিত নয়।
এরপর একই বছরের ১২ অক্টোবর ব্যাংকগুলোকে পৃথক নির্দেশনা দিয়ে এ ধরনের লেনদেন প্রতিরোধে সতর্কতা বাড়ানোর কথা বলা হয়। গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে যাতে ভার্চুয়াল মুদ্রাসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত না হয়, সে বিষয়ে নজরদারি জোরদার করতে বলা হয়েছিল। নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই অবস্থানই আবারও বহাল রাখল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনে ভার্চুয়াল মুদ্রার কোনো স্বীকৃতি নেই। এসব মুদ্রার বিপরীতে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিশ্চয়তাও থাকে না। ফলে প্রচলিত মুদ্রার মতো এগুলোকে নিরাপদ ও স্বীকৃত বিনিময় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ক্রিপ্টোকারেন্সির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বাজারমূল্যের দ্রুত পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা, সরবরাহ, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এসব ডিজিটাল সম্পদের দাম অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। এ ছাড়া ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেনে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তবে দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ডিজিটাল এই সম্পদের প্রতি আগ্রহ কমেনি। বরং অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এর ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বাড়ছে বলে সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান চেনালাইসিসের প্রকাশিত ‘দ্য ২০২৬ জিওগ্রাফি অব ক্রিপ্টো রিপোর্ট’ অনুযায়ী, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের সূচকে বিশ্বের ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬তম। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের প্রবণতায় বাংলাদেশের উপস্থিতি রয়েছে।
একই সূচকে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ষষ্ঠ, পাকিস্তান ২৫তম এবং শ্রীলঙ্কা ৮২তম অবস্থানে রয়েছে। এই অবস্থানগুলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, ক্রিপ্টোকারেন্সির বিস্তার বিশ্বজুড়েই আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে সীমান্ত পেরিয়ে দ্রুত অর্থ স্থানান্তর, লেনদেনের পরিচয় শনাক্ত করার জটিলতা এবং বাজারমূল্যের অস্থিরতা আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনার ফলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সিসংক্রান্ত লেনদেন পরিচালনার সুযোগ আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সম্পদ নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকায় এ বিষয়ে সচেতনতা, আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিনিষেধ মেনে চলার গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে।


