খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের খাগড়াছড়ির অস্থিরতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্প গভীর সংকটে পড়েছে; বিশেষত পর্যটকদের প্রিয় স্থান রাঙ্গামাটির সাজেক এখন সম্পূর্ণ জনশূন্য। যেহেতু খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেক ভ্রমণের রাস্তাটি অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক, তাই অধিকাংশ পর্যটক এই পথ ব্যবহার করেন। সাম্প্রতিক গোলযোগের জেরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি এবং প্রতিবাদকারীদের ‘অস্থায়ীভাবে পর্যটন স্থগিত’ ঘোষণার ফলে এমন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর একজন উপজাতি কিশোরী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর জেলা প্রশাসন শনিবার থেকে ১৪৪ ধারা বলবৎ করে। এর আগেই সাজেকে পৌঁছানো পর্যটকরা আটকে গিয়েছিলেন। সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স এসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বর্তমান সপ্তাহের পূজার অবকাশ সামনে রেখে প্রায় শতাধিক রিসর্টের সব আসন সংরক্ষিত থাকলেও, এখন একের পর এক বুকিং বাতিল হচ্ছে।
অবশ্য, বান্দরবান এবং রাঙ্গামাটির অন্যান্য ভ্রমণকেন্দ্রগুলো খোলা রয়েছে এবং সেখানের পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় বহু পর্যটক শুক্রবার সকাল থেকে ওই দুটি জেলায় যাত্রা শুরু করেছেন। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে তিন জেলার মধ্যে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় কেন্দ্র সাজেক থেকে দুই হাজারেরও অধিক পর্যটককে নিরাপত্তা রক্ষীদের তত্ত্বাবধানে জেলা সদরে ফিরে আসতে হয়েছে।
খাগড়াছড়ি শহরের হোটেলগুলোও এখন শূন্য। একটি হোটেলের ম্যানেজার বলেছেন, শুক্রবার থেকে শুরু করে এই চলতি সপ্তাহের সব আগাম বুকিং তাদের বাতিল করতে হয়েছে। তিনি জানান, এলাকার বেশিরভাগ হোটেলের ক্ষেত্রেই একই দশা।
অবশ্য খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে খুব দ্রুতই এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
সাজেকের অবস্থা খাগড়াছড়ি দিয়ে প্রবেশ সহজ হলেও সাজেক ভ্যালি মূলত রাঙ্গামাটি জেলার উত্তরতম প্রান্তে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত। এর উত্তর ও পূর্ব দিকে ভারতীয় সীমানা বিদ্যমান। রুইলুইপাড়া (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭২০ ফুট উচ্চতায়, যা ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত) এবং কংলাক পাড়ার (১৮০০ ফুট উচ্চতার কংলাক পাহাড়ে অবস্থিত) সমন্বয়ে সাজেক গঠিত। সাজেকে প্রধানত লুসাই, পাংখোয়া এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর আদিবাসীরা বসবাস করে। খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার, যা বর্তমানে একরকম বন্ধ রয়েছে।
খাগড়াছড়ি ও সাজেকের হোটেল এবং রিসর্টের মালিকেরা জানাচ্ছেন যে, এই সপ্তাহের পূজার অবকাশের জন্য তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে আয়োজন করছিলেন। সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স এসোসিয়েশন জানিয়েছে, সাজেকে বর্তমানে মোট ৮৫টি রিসর্ট রয়েছে। পাশাপাশি জেলা সদর এলাকায় জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী আরও অন্তত ২০টি বেসরকারি হোটেল রয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে সরকারি কিছু আবাসনেও পর্যটকদের সমাগম ঘটে। খাগড়াছড়ি সদরের পরিচিত আবাসিক হোটেল ‘গাইরিং’-এর ব্যবস্থাপক প্রান্ত বিকাশ ত্রিপুরা উল্লেখ করেন, তাদের হোটেল এখন সম্পূর্ণরূপে ফাঁকা। তিনি জানান, “চলতি সপ্তাহের সব বুকিং বাতিল হয়েছে। হোটেল সম্পূর্ণ খালি।” অপরদিকে সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স এসোসিয়েশনের সহ-প্রচার সম্পাদক মাইনুজ্জামান সরকার বলেন, সাজেকের ৮৫টি রিসর্টে সব মিলিয়ে ২৬০০ থেকে ৩০০০ আসন সংরক্ষিত ছিল। “সব আসন পরিপূর্ণ ছিল। এখন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর্যটকরা কেউ পরে যাওয়ার কথা বললেও, অনেকেই টাকা ফেরত দাবি করছেন। পর্যটকশূন্যতার ফলে পূজার উৎসবের সময়ের ব্যবসা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,” তিনি জানান।
স্থানীয় সূত্রানুসারে, রাস্তা অবরোধ এবং সহিংসতাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে সাজেকে আটকে থাকা প্রায় দুই হাজার ভ্রমণকারীকে সেনাবাহিনীর পাহারায় শনিবার রাতে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে নামিয়ে আনা হয়েছিল। এরপর শনিবার রাত থেকে রোববার সকালের মধ্যে এই পর্যটকদের বেশিরভাগই খাগড়াছড়ি ত্যাগ করেন। সেখানকার পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সাজেক ও খাগড়াছড়ির পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
খবরওয়ালা/টিএসএন