খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
শরীয়তপুরের সখিপুরে সাত মাসের এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে ঘরে একা পেয়ে ধর্ষণচেষ্টার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর থেকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগীর পরিবার। মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হয়ে উঠেছেন এলাকার সাধারণ মানুষ।
পুলিশ, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, সখিপুর থানার চরকুমারিয়া ইউনিয়নের ঢালী কান্দি গ্রামের মৃত গনি উকিলের সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে আইরিন লাবনী (২৩) শারীরিক অবস্থায় মায়ের সহযোগিতা পেতে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। অভিযুক্ত মিলন ঢালী (৩৩)—যিনি একই এলাকার আক্কাস ঢালীর ছেলে এবং চরকুমারিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি—দীর্ঘদিন ধরে আইরিনকে উত্ত্যক্তসহ নানা কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। স্থানীয় মুরুব্বিরা একাধিকবার সতর্ক করা সত্ত্বেও মিলন তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে ক্ষান্ত হননি।
গত ৫ আগস্ট দুপুরে আইরিন বাবার ঘরের ভেতর একা ছিলেন। এই সুযোগে অভিযুক্ত মিলন অসৎ উদ্দেশ্যে ঘরে প্রবেশ করেন এবং কথাবার্তার একপর্যায়ে আইরিনকে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের চেষ্টা চালান। আইরিন নিজের আত্মরক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা চালান এবং চিৎকার শুরু করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মিলন ওই অন্তঃসত্ত্বা নারীকে এলোপাতাড়ি মারধর করে জখম করেন। পরবর্তীতে স্থানীয়দের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘটনা জানাজানি করলে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে পালিয়ে যান তিনি।
গুরুতর আহত ও অসুস্থ অবস্থায় স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে অবিলম্বে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। চিকিৎসা শেষে ৯ আগস্ট ভুক্তভোগীর মা নাজমা বেগম বাদী হয়ে অভিযুক্ত মিলন ঢালী এবং তার সহযোগী আনোয়ার ঢালীর (৩৬) বিরুদ্ধে সখিপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর নেমে আসে নতুন আতঙ্ক। অভিযোগ রয়েছে, গত ১১ আগস্ট দুপুরে অভিযুক্ত মিলন ঢালী ফোন করে ভুক্তভোগীর পরিবারকে পেট্রোল বোমা মেরে ঘরবাড়ি উড়িয়ে দেওয়া এবং সবাইকে সপরিবারে হত্যার হুমকি দেন। প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের আশঙ্কায় গত সাত দিন ধরে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে নিকটাত্মীয়দের বাড়িতে ফেরারী জীবনযাপন করছেন গর্ভবতী নারী ও তার পরিবার।
সহায় সম্বলহীন ভুক্তভোগী আইরিন লাবনী আকুতি জানিয়ে বলেন:
“আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। এই অবস্থায় ঘরের মধ্যে একা পেয়ে মিলন আমার ওপর নির্যাতন চালায়। এখন আমরা ন্যায়বিচার চাইতে গিয়েও শান্তিতে থাকতে পারছি না। প্রতিনিয়ত মারধর ও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। প্রশাসনের কাছে আমি সঠিক বিচার চাই।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীর মা নাজমা বেগম বলেন, “আমার স্বামী নেই, দেখার কেউ নেই। মামলা করে আজ আমরা নিজেরাই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। মিলন এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ কথা বলতে সাহসের পরিচয় দেয় না। মেয়েটিকে মারধরের কারণে ডাক্তার বলেছেন সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে। আমি সরকারের কাছে পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা এবং অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।”
অভিযুক্ত মিলনের বেপরোয়া আচরণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সামাজিক মাতবর ওয়াসিম ঢালী জানান, রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে মিলন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর এমন অন্যায়ের পর সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হওয়া জরুরি। অপর এক স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন সরদার মিলনকে মাদকসেবী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার না করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে অভিযুক্ত মিলন ঢালী আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তায় নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ভুক্তভোগীর ভাইয়ের নিকট পাওনা টাকা চাওয়া কেন্দ্র করে কেবল কথা কাটাকাটি হয়েছিল; ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাটি ভিত্তিহীন।
বাংলাদেশ ছাত্রদলের জেলা আহ্বায়ক এইচ এম জাকির হোসেন জানান, সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংগঠনটির কোনো হালনাগাদ কমিটি সক্রিয় নেই। ফলে দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার দায়িত্ব সংগঠন বহন করবে না। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে দলীয় পদের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলার বর্তমান অগ্রগতি প্রসঙ্গে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন জানান, লিখিত অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সখিপুর থানায় একটি ধর্ষণচেষ্টার মামলা রুজু করে নথি আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামি পলাতক থাকায় তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান জোরালো করা হয়েছে। পরিবারটিকে হুমকির বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য