খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৪:১৯ পিএম
নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রক্রিয়াগতভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদ সচিবালয়। তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে শিগগিরই নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে। এরপর নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে সাতক্ষীরা-৪ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হবে কি না।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানিয়ে এবং তার সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে জামায়াতে ইসলামী স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই সংসদ সচিবালয় থেকে নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হবে।
সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী স্পিকারের কাছে গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এখন সংসদ সচিবালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো। নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ সচিবালয়কে জানাবে। পরে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হলে সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সংসদ সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করবেন।
গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্নের সূত্রপাত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিওকে কেন্দ্র করে। ভিডিওগুলো প্রকাশ্যে আসার পর তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে সাংগঠনিক তদন্ত করে জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ২২ জুলাই বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২৩ জুলাই জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি দেন।
চিঠিতে বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের পরিপ্রেক্ষিতে দলের পক্ষ থেকে সাংগঠনিক তদন্ত করা হয়। তদন্তে তার নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করে দলটি। এ কারণে জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ জানানো হয়।
তবে দল থেকে বহিষ্কার করলেই একজন সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় কি না, সে প্রশ্নে সাংবিধানিক বিধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে। কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দুই বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে নির্দিষ্ট শর্তে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হতে পারেন। সাজা ভোগের পরও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির বক্তব্য অনুযায়ী, গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান সরাসরি প্রযোজ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কারণ তিনি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেননি এবং সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও ভোট দেননি। আবার নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতের রায় বা কারাদণ্ডের তথ্য নেই। ফলে শুধু দলীয় বহিষ্কারের ভিত্তিতে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে কি না, সেটি এখন নির্বাচন কমিশনের আইনগত বিবেচনার বিষয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে শুরু থেকেই নানা আলোচনা ছিল। জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মী প্রথম দিকে ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বলে দাবি করেছিলেন। পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভিডিওতে থাকা নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম হিসেবে পরিচয় দেন। তার দাবি, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে তিনি মরিয়ম বেগমকে বিয়ে করেন।
ফলে বিষয়টি শুধু দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়েও সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্ন সামনে এসেছে। এখন নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকেই নজর রয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে, সাতক্ষীরা-৪ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হবে কি না এবং হলে পরবর্তী সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়া কী হবে।
মন্তব্য