খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
সম্প্রতি গুগল সার্চ ইঞ্জিনে একটি অদ্ভুত ও বেশ চাঞ্চল্যকর বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা গুগলে ‘চোরের দলের ফুটবল খেলা কবে’ লিখে অনুসন্ধান করলেই সার্চ ফলাফলের একদম শুরুতে চলে আসছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনাল ম্যাচের সময়সূচি ও বিস্তারিত তথ্য। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং বিভিন্ন ট্রোল গ্রুপে এটি হু হু করে ভাইরাল হয়ে গেছে। অনেকেই অবাক হয়ে ভাবছেন, গুগলের মতো বিশ্বসেরা সার্চ ইঞ্জিন কেন আলবিসেলেস্তেদের এমন নামে দেখাচ্ছে?
তবে প্রযুক্তি ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গুগলের কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ নয়। মূলত এর পেছনে কাজ করছে গুগলের স্বয়ংক্রিয় সার্চ অ্যালগরিদম ও এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন) প্রক্রিয়া। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড। এই মহারণকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যান্য দেশের ফুটবল সমর্থকদের একটি বড় অংশ বিপুল পরিমাণ ট্রোল পোস্ট, ভিডিও, মিম ও ব্যঙ্গাত্মক ক্যাপশনে আর্জেন্টিনা দলকে লক্ষ্য করে ‘চোরের দল’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমী যখন একই ধরণের শব্দ লিখে সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটে পোস্ট করতে থাকেন, তখন গুগলের অ্যালগরিদম ওই নির্দিষ্ট কিওয়ার্ড বা শব্দগুচ্ছের সঙ্গে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের একটি শক্তিশালী যোগসূত্র তৈরি করে নেয়। ফলে কেউ ওই ব্যঙ্গাত্মক লাইনটি লিখে সার্চ করলেই গুগল যান্ত্রিকভাবে আসন্ন হাইভোল্টেজ ম্যাচের ফলাফল ও সূচি প্রদর্শন করছে।
এই সুনির্দিষ্ট ট্রোল এবং ব্যঙ্গাত্মক নামকরণের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও বিতর্কিত এক অধ্যায়। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বৈরিতার কারণে সেই ম্যাচটি কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র চার বছর আগে, ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের (ইংল্যান্ড) মধ্যে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল, যা ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ওই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল। ফলে ফুটবল মাঠে দুই দলের মুখোমুখি হওয়াটা দুই দেশের মানুষের কাছে এক ভিন্ন মাত্রার প্রতিশোধ ও মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছিল।
সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্যভাবে শেষ হলেও দ্বিতীয়ার্ধের মাত্র ৪ মিনিটের ব্যবধানে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা এমন দুটি গোল করেন, যা ফুটবল ইতিহাসকে চিরদিনের জন্য বদলে দেয়। খেলার ৫১তম মিনিটে ইংল্যান্ডের পেনাল্টি বক্সের ভেতর বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুলবশত নিজেদের গোলপোস্টের দিকে বল ভাসিয়ে দেন ইংলিশ ডিফেন্ডার স্টিভ হজ। তখন বলটি বাতাসে ভাসমান অবস্থায় ম্যারাডোনা এবং ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন দুজনেই লাফিয়ে ওঠেন। শিলটন ম্যারাডোনার চেয়ে উচ্চতায় অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও ম্যারাডোনা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে তাঁর বাম হাত ব্যবহার করে বলটি শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে জালে ঠেলে দেন। তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের ম্যারাডোনার হাতের স্পর্শ বা ফাউলটি খেয়াল করতে না পারায় এটিকে বৈধ গোল হিসেবে ঘোষণা করেন।
ম্যাচ শেষে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে সেই বিতর্কিত গোল নিয়ে ম্যারাডোনা রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘গোলটি কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত (হ্যান্ড অব গড) দিয়ে করা হয়েছিল।’ ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ও বিতর্কিত গোলের ক্ষোভ ইংলিশ সমর্থকেরা আজও ভুলতে পারেননি। সেই ঘটনার জের ধরেই প্রতিপক্ষ ফুটবল দলের সমর্থকদের একটি অংশ আর্জেন্টিনাকে ব্যঙ্গ করে ‘চোর’ বা ‘চোরের দল’ বলে আখ্যায়িত করে থাকে। দীর্ঘ ২৪ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও সেমিফাইনালের মঞ্চে এই দুই পরাশক্তি মুখোমুখি হতে চলায় ৪০ বছর আগের সেই ঐতিহাসিক বিতর্কটি নতুন করে ইন্টারনেটে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি কেবলই একটি সাময়িক সাইবার ট্রোল ও মিম সংস্কৃতির অংশ, যা ভাইরাল কনটেন্টের প্রভাবে গুগলের সার্চ রেজাল্টে সাময়িকভাবে প্রভাব ফেলেছে। এর সাথে বাস্তব কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের সম্পর্ক নেই।