বরিশালের উজিরপুরে বাসাবাড়িতে নারীদের গোপনে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ এবং সেসব ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শনিবার (৭ নভেম্বর) গভীর রাতে উজিরপুর শহরের উপজেলা পরিষদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করার আগে বিক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকজন তাঁকে গণপিটুনি দেন।
আটক ব্যক্তির নাম বায়জীদ হোসেন মিঠু। তিনি উজিরপুর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। রোববার (৮ নভেম্বর) ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বায়জীদ হোসেন মিঠু দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে নারীদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও গোপনে ধারণ করতেন। এ জন্য তিনি বাড়ির জানালা ও বাথরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁক ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নারীদের অজান্তে ধারণ করা এসব ভিডিও পরবর্তী সময়ে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো এবং ব্ল্যাকমেইলের কাজে ব্যবহার করা হতো বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ অনুযায়ী, গোপনে ধারণ করা ভিডিও দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট নারীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা করতেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া বাকি।
শনিবার গভীর রাতে উপজেলা পরিষদ এলাকার একটি বাসার বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে গোপনে ভিডিও ধারণের সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে দেখতে পান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তাঁরা এগিয়ে গিয়ে তাঁকে হাতেনাতে আটক করেন। পরে আশপাশের লোকজন জড়ো হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁকে মারধর করেন।
খবর পেয়ে উজিরপুর মডেল থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় নারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটকের পর অভিযুক্ত মিঠুর ব্যবহৃত মুঠোফোন তল্লাশি করে পাঁচটি আপত্তিকর ভিডিও পাওয়া গেছে। ভিডিওগুলোর বিষয়বস্তু, সেগুলো কীভাবে ধারণ করা হয়েছে এবং কারা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব ভিডিওর সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের উত্থাপিত অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রকিবুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির মুঠোফোনে পাওয়া ভিডিওগুলোর বিষয়বস্তু পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ধরনের ঘটনায় নারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদার প্রশ্নটি বিশেষভাবে সামনে আসে। বাসাবাড়ির মতো ব্যক্তিগত পরিসরেও যদি কেউ গোপনে ভিডিও ধারণের শিকার হন, তাহলে তা তাঁদের নিরাপত্তাবোধ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। গোপন ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ কিংবা সেগুলো ব্যবহার করে কাউকে ভয় দেখানো বা ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ গুরুতর অপরাধের ইঙ্গিত দেয়। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করাও জরুরি।
অন্যদিকে, অপরাধের অভিযোগে কাউকে আটক করা হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হওয়া বা প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় বিচার নিশ্চিত করাই প্রত্যাশিত।
এখন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা, উদ্ধার করা ভিডিওগুলোর উৎস এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্ভাব্য অপরাধের পরিধি নির্ধারণের অপেক্ষা। একই সঙ্গে এ ঘটনায় কোনো নারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তাঁর পরিচয় ও সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।


