জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে দেওয়ায় জামালপুরের তারাকান্দিতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী যমুনা সার কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন ফের অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) সকাল থেকে সার তৈরির মূল প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থগিত হয়ে পড়ে। মাত্র দুই দিন আগে, অর্থাৎ ১৫ দিন ধরে চলা বয়লারের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত শেষ করে ২৩ অক্টোবর কারখানাটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছিল। তবে চালুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় আবার উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
যমুনা সার কারখানার ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গ্যাস সংযোগ কেটে দেওয়ায় কারখানা চালু রাখা সম্ভব হয়নি। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ তাঁদের মৌখিকভাবে জানিয়েছে যে আগামী ডিসেম্বর মাসের আগে কারখানায় পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করার সম্ভাবনা কম।
কারখানা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯৯১ সালে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার তারাকান্দিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই সার কারখানাটি। প্রতিষ্ঠাকালে প্রতিদিন এর উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১,৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া। তবে দিন দিন গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার কারণে পরবর্তীতে দৈনিক উৎপাদনের এই হার ১,৩০০ মেট্রিক টনে নেমে আসে। গত বছরও তীব্র জ্বালানি সংকট গ্রাস করেছিল এই প্রতিষ্ঠানটিকে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে ২০২৩ সালের ২১ জুন কারখানার উৎপাদন স্তব্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ আলোচনা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গ্যাসের সরবরাহ মেলায় ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর আবার ইউরিয়া তৈরি শুরু হয়।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, যান্ত্রিক বিভ্রাট ও নানা জটিলতা কারখানাটির পিছু ছাড়ছে না। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ তানাজি এস পন্দেকারের নেতৃত্বে একটি কারিগরি দল কারখানার অ্যামোনিয়া প্লান্টের এনজি বুস্টার কমপ্রেসার পরিদর্শনে এসেছিলেন। পরিদর্শনকালে অসাবধানতাবশত একটি ভুল বোতামে চাপ পড়ায় বিকট শব্দে অ্যামোনিয়া প্লান্ট বন্ধ হয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে সার ও অ্যামোনিয়া উৎপাদন স্তব্ধ হয়ে পড়ে। সেবার কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের টানা কয়েক দিনের চেষ্টায় ইউরিয়া উৎপাদন সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও কিছুদিনের মধ্যেই রিফরমার টিউবে লিকেজ দেখা দেয়। ফলে ফের বন্ধ রাখতে হয় সার্বিক কারখানা কার্যক্রম।
বর্তমানে পুনরায় উৎপাদন থমকে যাওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে সার সরবরাহে মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইলসহ দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের প্রায় ১৯টি জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি মূলত এই কারখানার সারের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। সার কারখানাটি দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকলে স্থানীয় খুচরা ও পাইকারি বাজারে ইউরিয়া সারের কৃত্রিম সংকট দেখা দিতে পারে, যার সরাসরি ধাক্কা গিয়ে পড়বে সাধারণ চাষিদের ওপর।
একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বন্ধ থাকায় সরকারকে অতিরিক্ত ইউরিয়া সার বিদেশ থেকে চড়া দামে আমদানি করতে হবে। এতে জাতীয় রাজকোষ থেকে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি সরকারের সার্বিক বাজেটেও বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করবে। দ্রুত বিকল্প উপায়ে গ্যাস সরবরাহ করে কারখানা চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা।


