খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই আগস্ট ২০২৬, ২:৪৫ পিএম
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে টানা তিন দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে শিল্প উৎপাদন। জেলার ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পকারখানার মধ্যে অন্তত দেড় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম থেমে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে কম চাপের গ্যাস পাওয়ার পর বুধবার থেকে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এতে কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের দাবি, প্রতিদিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে কারখানায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা এবং বারবার চালু-বন্ধ করার কারণে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা থাকায় কোনো কোনো কারখানা কার্যত অন্ধকার হয়ে পড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক ও কর্মচারী বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কাজ করেন। উৎপাদন বন্ধ থাকায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার হাজিরা ঠিক রাখা হলেও কার্যত কোনো কাজ হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে সংকট অব্যাহত থাকলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাজেদ হোসেন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের মেশিনগুলো বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় এভাবে মেশিন বন্ধ থাকলে সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির একটি লাইনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৭ ঘনমিটার এবং অন্য লাইনে ৮৬ হাজার ২৮ ঘনমিটার। কিন্তু টানা তিন দিন ধরে কোনো লাইনেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার জানান, তাদের প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ ৩৫ হাজার ঘনমিটার গ্যাস প্রয়োজন। সে হিসাবে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ ঘনমিটার। শুক্রবার সকালে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও সেটি স্থায়ী হয়নি। সকালে প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ থাকলেও দুপুর ১২টার দিকে তা কমে প্রায় ২০ শতাংশে নেমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে মেশিন চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া বা গ্যাসের চাপ ওঠানামার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব যন্ত্রের কিছু নষ্ট হলে তা মেরামত করাও কঠিন। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকার ক্ষতির সঙ্গে যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বাড়তি ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
আবুল বাশারের দাবি, সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে রপ্তানি কার্যক্রমেও পড়তে শুরু করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রপ্তানি প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্ডার বাতিল হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। তিনি মনে করেন, শিল্পে কর্মরত দেড় লাখ শ্রমিকের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়লেও এর প্রভাব তাদের পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থার ওপরও ছড়িয়ে পড়ে। সুতা, কাপড় ও পোশাক উৎপাদনের মতো পরস্পরনির্ভর শিল্পগুলোতে একটি অংশে উৎপাদন বন্ধ হলে তার প্রভাব অন্য অংশেও পড়ে।
সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, শুক্রবার তাদের কারখানায় একেবারেই গ্যাস ছিল না। তবে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়নি। গ্যাস সরবরাহ আবার শুরু হলেই যাতে দ্রুত উৎপাদন চালু করা যায়, সে আশায় কর্মীদের ধরে রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, গ্যাসের অনুপস্থিতি এবং বারবার সরবরাহ চালু-বন্ধ হওয়ার কারণে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতি এমনও রয়েছে, যেগুলো নষ্ট হলে মেরামত করা প্রায় অসম্ভব।
শিল্পকারখানার কর্মীদের মধ্যেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ জানান, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক উৎপাদন সম্ভব হচ্ছিল না। এখন সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজও বন্ধ রয়েছে। এভাবে দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে আয়-রোজগার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে বলে আশঙ্কা তাঁর।
নারী কর্মচারী শেফালী বেগম বলেন, প্রতিদিনের কাজের আয়ের ওপরই তাঁদের সংসার নির্ভর করে। কারখানা বন্ধ থাকলে কাজের সুযোগ যেমন থাকে না, তেমনি আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। সংকট কতদিন চলবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য না থাকায় শ্রমিকদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
স্থানীয় শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও শ্রমিক-কর্মচারীদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন ইউনিটগুলোতে নেমে এসেছে নীরবতা। আবার কিছু কারখানায় শ্রমিকদের হাজিরা রাখা হলেও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কর্মঘণ্টা পার হলেও শ্রমিকদের অনেককে কার্যত বসে থাকতে হচ্ছে।
জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সরবরাহ আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ আগস্ট থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে—এমন কথা শোনা গেলেও এ বিষয়ে তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
তিনি বলেন, গ্যাস বিতরণের দায়িত্ব তাদের হলেও সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তাদের একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে পেট্রোবাংলা।
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ নিয়ে সংকট চলছিল। শুরুতে কম চাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলেও বুধবার থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়। এরপর গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেড় শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
শিল্পোদ্যোক্তারা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু তাৎক্ষণিক উৎপাদন ক্ষতিই নয়, রপ্তানি আদেশ, শিল্পকারখানার আর্থিক সক্ষমতা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থাতেও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধার এখন হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য